পশ্চিমবঙ্গের উত্তর ২৪ পরগনা জেলার শিয়ালদহ-বনঁগা লাইনের গোবরডাঙা স্টেশন থেকে মাত্র ১১ কিমি দূরে বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী সবুজেঘেরা সুন্দর একটি গ্রাম হল “বেড়ি পাঁচপোতা”। গ্রামটির বুকের উপর দিয়ে তিরতির করে বয়ে চলেছে ছোট্ট একটি অশ্বখুরাকৃতি হ্রদ, স্থানীয় ভাষায় যাকে বাওর বলা হয়। অনেকদিন আগে এটি ইছামতি নদীর অংশ ছিল। তারপর ইছামতি নদী আস্তে আস্তে দিক পরিবর্তন করে একটু দূরে চলে যাওয়াই এটি মূল নদী থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে অশ্বখুরাকৃতি হ্রদে পরিনত হয়েছে। খুব সম্ভবত এই হ্রদটিই হল রাজ্যের সবথেকে বড় অশ্বখুরাকৃতি হ্রদ। এছাড়াও বেড়ি পাচঁপোতা সংলগ্ন কাছাকাছি আরো অনেকগুলি হ্রদ (শশাডাঙা বাওর, ডুমোর বাওর, বলদে ঘাটার বাওর প্রভৃতি) আছে, যাদের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্য আমাদের রাজ্যে তো বটেই, সারা ভারতবর্ষেও বিরল।

আমেরিকান বা ইউরোপিয়ান দেশগুলির মতো ইকোট্যুরিজমের মাধ্যমে বেড়ি পাঁচপোতাকে কেন্দ্র করে চারটি পঞ্চায়েতের প্রায় দশহাজার মানুষ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ভাবে উপকৃত হতে পারেন। প্রায় দুবছর ধরে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম ও সোশ্যাল মিডিয়া তথা ফেসবুক, হোয়াটঅ্যাপ, ইউটিউব ইত্যাদির মাধ্যমে আমরা কয়েক মিলিয়ন ভ্রমণপিপাষু মানুষের কাছে তুলে ধরেছিলাম বেড়ি পাঁচপোতার সৌন্দর্য্যের কথা। এরফলে বেসরকারী ভাবে প্রচুর মানুষ ইতিমধ্যে এই এলাকাতে আসতে শুরু করেছেন। সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে শুধু ভারতবর্ষ নয় দেশের বাইরে থেকেও প্রচুর মানুষ বেড়াতে আসার জন্য আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। সামনের শীতের ছুটিতে পর্যটকদের সংখ্যা বহুগুন বাড়তে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। এখোনো পর্যন্ত এখানে সরকারীভাবে রাত্রিযাপনের কোনো ব্যবস্থা না থাকায় পর্যটকরা বিভ্রান্ত হয়ে পড়ছেন। এছাড়াও স্বীকৃত পর্যটন কেন্দ্র না হওয়াতে বিদেশী পর্যটকরা আসতে পারছেন না। আমরা চাইছি খুব তাড়াতাড়ি এখানে রাত্রে থাকার জন্য সরকারী সহায়তায় ছোট ছোট কটেজ ও হোমস্টে গড়ে উঠুক।

মুখ্যমন্ত্রীর কাছে আবেদন, স্থানীয় বাসিন্দা কিংবা স্থানীয় পঞ্চায়েত প্রশাসনের ইকোট্যুরিজম সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারনা না থাকার কারনে সরাসরি পর্যটন দপ্তরের মাধ্যমে আপনি নিজে এই বিষয়টিতে উদ্যোগ নিন। আমরা বিগত দুবছর ধরে ইকোট্যুরিজম সমৃদ্ধ আমেরিকান ও ইউরোপিয়ান দেশগুলির ইকোট্যুরিজম সম্পর্কিত হোমস্টের মালিক, স্থানীয় গ্রামবাসী, প্রবাসী ভারতীয়দের সংগঠন, বিদেশী পর্যটক, ট্রাভেল এজেন্ট এবং স্থানীয় প্রশাসনের সাথে কথা বলেছি। সেই অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যে সমৃদ্ধ বেড়ি পাঁচপোতাতে ইকোট্যুরিজম গড়ে তোলার ক্ষেত্রে প্রাথমিক ভাবে দরকার শুধুমাত্র নূন্যতম পরিকাঠামো (ছোটো ছোটো কটেজ তৈরি ও হোমস্টের জন্য অনুমোদন) এবং সরকারী স্বীকৃতি। আমরা ইতিমধ্যে সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে সারা দেশ সহ আন্তর্জাতিক মাধ্যমের বিভিন্ন পর্যটকদের সামনে তুলে ধরেছি বেড়ি পাঁচপোতার কথা। প্রত্যেকেই খুব আপ্লুত এবং এখানে বেড়াতে আসার জন্য উদগ্রিব। আমরা আশাবাদি সরকারী স্বীকৃতি দেওয়ার অন্তত ছয়মাসের মধ্যেই পর্যটকদের সংখ্যাতে “বেড়ি পাঁচপোতা পর্যটন কেন্দ্র” টক্কর দেবে পশ্চিমবঙ্গের অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটন কেন্দ্র দীঘা কিংবা বকখালির সাথে।

অক্টোবর থেকে মার্চ এই পাঁচ মাস “বেড়ি পাঁচপোতা” বেড়ানোর পক্ষে আদর্শ। সুটিয়া, রামনগর, ঝাউডাঙা ও সগুনা এই চারটি পঞ্চায়েতের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে উপকৃত অন্তত দশহাজার মানুষের কর্মসংস্থানের কথা ভেবে আমরা মুখ্যমন্ত্রীকে অনুরোধ করব পরীক্ষামূলক ভাবে অল্পকিছু কটেজ বা হোমস্টের অনুমোদন দিয়ে পর্যটন দপ্তরের সহযোগীতায় শীতের আগেই আপনার হাতে উদ্ভোধন হোক নতুন এই পর্যটন কেন্দ্রের।

প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যে সমৃদ্ধ বেড়ি পাঁচপোতাকে আমেরিকান বা ইউরোপিয়ান পর্যটন কেন্দ্রেগুলির আদলে গড়ে তোলার জন্য সরকারী চিন্তাভাবনার সাথে নিম্নলিখিত পদক্ষেপগুলি যুক্ত করা যেতে পারে।

১) বেড়ি পাঁচপোতা সংলগ্ন সুটিয়া, রামনগর, ঝাউডাঙা ও সগুনা এই চারটি পঞ্চায়েত নিয়ে গড়ে উঠুক “বেড়ি পাঁচপোতা পর্যটন কেন্দ্র” উন্নয়ন পর্যদ। উচ্চক্ষমতা সম্পন্ন এই পর্যদের মাধ্যমেই অতি দ্রুত পুরো পরিকল্পনা বাস্তবায়িত করা হোক।

২) কংক্রিট নির্মানের তুলনায় জোর দেওয়া হোক ছোট ছোট কটেজ ও হোমস্টের উপর। বিশেষজ্ঞদের দ্বারা ডিজাইন করা হোক এই সমস্ত কটেজ ও হোমস্টেগুলির। অন্যান্য জায়গার থেকে একটু আলাদা অভিনবত্ব থাকুক বেড়ি পাঁচপোতা পর্যটন কেন্দ্রের কটেজ ও হোমস্টেগুলিতে।

৩) বেড়ি পাঁচপোতার পুরো তথ্য ট্যুরিজম ডিপার্টমেন্টের ওয়েবসাইটে থাকার পাশাপাশি তৈরি হোক বেড়ি পাঁচপোতার নিজস্ব ওয়েবসাইট, নিজস্ব লোগো এবং থাকুক নিজস্ব ব্রান্ড অ্যাম্বাসেডর (বিপনন দূত)। যাঁর মাধ্যমে আমরা সারা বিশ্বের ভ্রমণপিপাষু মানুষের কাছে পৌছাতে পারবো। এছাড়াও পর্যটনের সাথে যুক্ত স্থানীয় মানুষদের জন্য বিশেষ প্রশিক্ষনের ব্যবস্থা করা হোক। ভিন রাজ্যের ও বিদেশী পর্যটকদের সাথে কথোপকথনের জন্য স্পোকেন হিন্দি ও স্পোকেন ইংলিশ শেখানোর ব্যবস্থা করা দরকার।

৪) বেড়ি পাঁচপোতা সংলগ্ন ৮ থেকে ১০ কিমি ব্যার্সাধের মধ্যে চারটি বড় বড় হ্রদ আছে। পর্যটকদের মনোরঞ্জনের জন্য এই হ্রদগুলিতে থাকুক বোটিং এর সুব্যবস্থা। যন্ত্রচালিত বোটের পরিবর্তে ইউরোপের দেশগুলির মতো হ্রদে ভাসুক রং-বেরং এর পানসী নৌকা। এছাড়াও পর্যটকদের জন্য থাকুক হাউস বোটিং ও ফিসিং এর ব্যবস্থা। এছাড়াও হ্রদতীরবর্তী কিছু কিছু জায়গাতে দোলনা, স্কাই ওয়াক ইত্যাদি মজাদার গেমসের ব্যবস্থা করতে হবে।

৫) এই পর্যটন কেন্দ্রের মধ্যে প্লাস্টিক নিষিদ্ধ করার পাশাপাশি স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে মাটির ভাড়ঁ ও কাগজের ঠোঙা তৈরির জন্য উৎসাহ ও প্রশিক্ষনের ব্যবস্থা করতে হবে। এছাড়াও শালপাতা, কলারপাতা ইত্যাদি প্রাকৃতিক জিনিষের উপর জোর দিতে হবে। প্রয়োজনে স্বনির্ভর গোষ্ঠীগুলির মাধ্যমে এগুলি করা যেতে পারে।

৬) সৌন্দর্যায়নের জন্য হ্রদের দুধার দিয়ে লাগানো হোক তাল, নারিকেল, সুপারী, আমলকি সহ বিভিন্ন প্রজাতীর দেশীয় মরসুমি ফল ও ফুলের গাছ। এতে পাখিদের আনাগোনা তো বাড়বেই সেই সাথে পর্যটকদেরও ভালো লাগবে। হ্রদের ধারে পর্যটকদের জন্য প্রাকৃতিক উপাদান দিয়ে তৈরি বিশ্রাম কক্ষ বা বসার সুব্যবস্থা করতে হবে।

৭) চারটি হ্রদ ছাড়াও কাছেই আছে ইছামতী ও যমুনা নদী । এছাড়াও বেশ কিছু ছোট ছোট খাল বা জলাশয় আছে। যেগুলি পরিস্কার পরিচ্ছন্ন করে সরকারী উদ্যোগে দেশি মাছ ছাড়ার ব্যবস্থা করা হোক। স্থানীয় মানুষের জীবিকার পাশাপাশি পর্যটকদের কাছে পৌছে দেওয়া যাবে হারিয়ে যাওয়া বিভিন্ন দেশি মাছের সুস্বাদু পদ।

৮) এছাড়াও এই এলাকার মানুষদের বিকল্প জীবিকার জন্য সরকারী উদ্যোগে হাঁস-মুরগীর বাচ্চা বিতরন সহ প্রাকৃতিক ভাবে পালনের জন্য উৎসাহ দিতে হবে। এরফলে একদিকে যেমন ডিম ও মাংস উৎপাদন বাড়বে, তেমনই পর্যটকদের কাছেও ফ্রেস ও টাটকা খাবার পৌছে দেওয়া যাবে। এলাকার ফসল উৎপাদনে সিকিম সরকারের মতো জৈব সারের উপর জোর দিতে হবে।

৯) পর্যটকদের যাওয়া-আসার সুবিধার জন্য কলকাতার ধর্মতলা থেকে বেড়ি পাঁচপোতা পর্যন্ত সরকারী ও বেসরকারী বাস পরিসেবা চালু করতে হবে। বেড়ি পাঁচপোতার নিকটবর্তী স্টেশন গোবরডাঙা থেকে বেড়ি পাঁচপোতা পর্যন্ত পর্যটকদের যাতায়াতের সুবিধার জন্য বৈদ্যুতিক এসি বাস পরিসেবা চালু করা প্রয়োজন। এছাড়াও রেলমন্ত্রকের সাথে কথা বলে পর্যটকদের সুবিধার্তে লোকাল ট্রেনের যে কোনো একটি বগিতে আসন সংরক্ষনের ব্যবস্থা করা যেতে পারে।

১০) এছাড়াও পর্যটকরা যাতে এই পর্যটন কেন্দ্রের মধ্যে দূষনমুক্ত যানবাহনে চলাফেরা করতে পারে তার জন্য টোটো, ভ্যান, সাইকেল ইত্যাদি যানবাহনের উপর জোর দিতে হবে। ভাড়া করা (ঘন্টা পিছু চুক্তিতে) বাইসাইকেল বা ট্রাই সাইকেলে চেপে পর্যটকরা যাতে এই এলাকা ঘুরতে পারে, তার জন্য সরকারী উদ্যোগে স্থানীয় বাসিন্দাদের মাধ্যমে ভাড়া দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে।

১১) বর্তমানে বেড়ি পাঁচপোতা গ্রামটি গাইঘাটা থানার অন্তর্গত। বেড়ি পাঁচপোতা সংলগ্ন প্রান্তিক গ্রামগুলি থেকে গাইঘাটা থানার দূরত্ব কমবেশি ২২ থেকে ২৫ কিমি। এত দূরে থানার অবস্থান হওয়াতে আইন-শৃঙ্খলাজনিত কাজে পুলিশের ঘটনাস্থলে পৌছাতে অনেক সময় লেগে যায়। এছাড়াও এতদূরবর্তী গ্রামগুলির উপর নজরদারী চালানো পুলিশের পক্ষে সম্ভবপর হয়ে ওঠে না। পর্যটকদের নিরাপত্তার কথা মাথায় রেখে বেড়ি পাঁচপোতা সংলগ্ন সুটিয়া গ্রামীনপুলিশ ফাঁড়িটিকে একটি পূর্নাঙ্গ থানাতে পরিনত করা দরকার।

১২) বেড়ি পাঁচপোতা সংলগ্ন সীমান্তবর্তী কালাঞ্চী, গড়জেলা, তেঁতুলবেড়িয়া ইত্যাদি গ্রামগুলি থেকে নিকটতম ঠাকুরনগর গ্রামীন হাসপাতালের দূরত্ব কমবেশি ১৮ থেকে ২০ কিমি এবং বঁনগা মহকুমা হাসপাতালের দূরত্ব ২৫ থেকে ৩০ কিমি। পর্যটকদের স্বাস্থ্যবিধির কথা মাথায় রেখে স্বাস্থ্যমন্ত্রকের সাথে কথা বলে বেড়ি পাঁচপোতা পর্যটনকেন্দ্র মধ্যস্থ বিষ্ণুপুর স্বাস্থ্যকেন্দ্রটির প্রয়োজনীয় পরিকাঠামো গড়ে তুলে আধুনিক হাসপাতালে পরিনত করা দরকার। এরফলে পর্যটকদের পাশাপাশি বেড়ি পাঁচপোতা ও পাশ্ববর্তী এলাকার কয়েকহাজার মানুষ উপকৃত হবে। এছাড়াও বেড়ি পাঁচপোতা থেকে ১২ কিমি দূরবর্তী গোবরডাঙা পৌরহাসপাতালটিও নতুন করে চালু করা প্রয়োজন।

ধন্যবাদান্তে,

জ্যোতি প্রকাশ ঘোষ

বেড়ি পাঁচপোতা

উত্তর চব্বিশ পরগনা

Advertisements