আমাদের অনেক গ্রেটা আছে – তাদের কেউ চিনবে না

রাহুলদেব বিশ্বাস

গ্রেটা থুনবার্গ আমার বোনের মত – সহযোদ্ধাও – পৃথিবীর যে কোন প্রান্তে যারা গাছ নদী পাহাড়ের পক্ষে দাঁড়ানোর সাহস দেখায় ; প্রত্যেকে আমরা সহযোদ্ধা | তাই গ্রেটাকে তার সাফল্যের জন্য শুভকামনা |

আমার প্রশ্নটা আপনাদের দিকে , আমাদের দেশে যে সব গ্রেটারা আছে তারা ধারে ভারে ও বলিদানে গ্রেটার থেকে এক ফোঁটাও কম না – গ্রেটার মত সেফ জোনে তারা বলে না , “How dare You…” , তারা পরিবেশ মাফিয়াদের চোখে চোখ রেখে বলে , “একটি গাছও কাটতে দেব না…” ; তবু তাদের কথা কেউ বলবে না – মিডিয়া চুপ ! আমি চুপ ! আপনি চুপ ! সবাই চুপ ! এরকমই এক গ্রেটার কথা লিখেছিলাম 2017 এর 17 ই অক্টোবর , কবি বিভাস রায় চৌধুরী তাকে নিয়ে কবিতাও লিখেছিল | সেই লেখাটাই আর একবার share করি |

মেয়েটির নাম রিমি
17th Oct , 2017

শুরুর শুরু
…………………

রিমিকে প্রথম দেখেছিলাম গাছ আন্দোলনের একটা পদযাত্রায় | ক্লাশ এইটের একটু বেশিই মিষ্টি মেয়ে | চোখ মুখে অসাধারণ সরলতা , আর চোখের ভিতরে কোথায় যেন একটা আগুন লুকিয়ে আছে | প্রথম দেখাতেই ভালো লেগে গিয়েছিল | ভেবেছিলাম কোন ভালো শিক্ষিত পরিবারের মেয়ে হবে | না হলে এত স্নিগ্ধতা এত শুদ্ধতা এত সারল্য এত জেদ কোথায় বা লালিত হতে পারে |

ভুলটা ভাঙল একদিন | রিনাদির বাড়িতে এসেছি একটা গাছ লাগানোর প্রোগ্রামের পর | রিমি ও এসেছিল | রিনাদির বাড়িতে আমি ,গার্গী , রিমি খুব খুনসুটি করলাম। মারপিট করলাম | তারপর প্রথম ওর চোখে জল দেখলাম | সেই প্রথম বার | আমি কেমন যেন ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেলাম | মুহুর্তে নির্বাক হয়ে গেলাম | ওই দুই চোখে কি কান্না মানায় ? ওই সারল্যে কি গরল থাবা বসাতে পারে ? মৃত্যু যেখানে সবুজ ফোটায় সেই বিশাল্যকরণীর বাগিচায় মরুভূমির অহঙ্কার দেখে কেমন যেন নিজেকে অসহায় লাগতে শুরু করল |

রিমিদের অতি দরিদ্র পরিবার | বাবা যেটুকু আয় করেন তার থেকে বেশি উড়ে যায় মদের নেশায় , আয়ের ঘাটতি উনি মেটান রিমি আর ওর মাকে নিয়মিত কিল চড় ঘুষি লাঠি আর অকথ্য গালিগালাজের রামধনু রঙে | একটি শিশুর বড় হয়ে ওঠার যা কিছু সুস্থ স্বাভাবিক উপকরন চাই , তার বিপরীতগুলি পেয়েই ও এত বড়টি হয়েছে |

শাওনের কুশীলবদের আড্ডাই রিমির কাছে একমাত্র বাঁচার অক্সিজেন | রিনাদির বাড়িটাই ওকে একমাত্র একটা স্বাধীন মুক্ত আকাশ দেয় | শাওন ব্যর্থ হয় নি | দুই বছর ধরে ওদের নিজের মনের মত তৈরি করার চেষ্টা করেছে | প্রতিদিন তিলে তিলে গড়ে উঠেছে একটা তরুনী | ঈশ্বরের অহঙ্কারও তিলে তিলে ক্ষয় হয়ে যাচ্ছে | রিমি যেন তাঁকে প্রতিদিন বলে চলেছে ; হে কাপুরুষ ঈশ্বর ,তুমি অভিশপ্ত কর , আমি অভিশাপকে মুক্ত করব |

শুরু
……………

টাকী রোডের ৭০০ শতাব্দী প্রাচীন মহীরুহ কেটে ফেলেছে লোভী অমানুষগুলি | সমস্ত রাস্তা জুড়ে মানবতার কবর রচিত হয়েছে মাত্র ছয় মাসের মধ্যে | রাস্তার এদিক ওদিক ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে মহীরুহগুলির কাটা হাত পা মাথা | ১৭ কিমি রাস্তাই যেন সদ্য সমাপ্ত মৃত যুদ্ধভূমি | জীবন নেই জীবন নেই জীবন নেই | পৃথিবীর ভিতরে আরেকটা পৃথিবী বাসা বেঁধেছে , যেখানে শুধুই ধ্বংসের গল্প , মৃত্যুর অহঙ্কার আর জল্লাদের রক্তচক্ষু | অমানুষদের নির্লজ্জতায় মানুষদের বুকে প্রথম কান্নার ঢেউ উঠতে শুরু করেছে | কেউ আর ঘরে থাকতে পারছে না | কাঁদতে কাঁদতে সকলে রাস্তায় নেমে পড়ছে | কেউ গাছকে জড়িয়ে ধরে কুড়ালের দাঁতকে রুখে দিচ্ছে , কেউ মানুষকে জাগাতে হেঁটে চলেছে মাসের পর মাস , কেউ কষ্টকে কলমে , কেউ কন্ঠে , কেউ গিটারে এনে জন্ম দিচ্ছে বিপ্লবের ভিত্তিভূমি |

গাছেদের ব্যথা জানাতে ২৬ কিমি পথ হাঁটার ডাক এল। রিমির নরকেও পৌঁছে গেল সেই ব্যথার কথা | নিজের ব্যথাকে মহীরুহের ব্যথার সাথে মিলিয়ে ফেলল ও | ব্যথার অনুরণন সৃষ্টি হল | নিজেকে বাড়িতে ধরে রাখার উপায় নেই ওর | বাড়িতে হাঁটার কথা জানাতে স্বাভাবিক ভাবে ওর কপালে জুটল নির্মম অত্যাচার , গালিগালাজ | হাঁটার আগের দিন বাড়ি থেকে পালিয়ে বিশ্বনাথপুরের (দেগঙ্গা) দিকে আসার চেষ্টা করল ও | কিন্তু ও ব্যর্থ হল | পথেই ধরা পড়ে গেল বাবার কাছে | রাস্তায় চলল নির্মমতা | ইটের শক্ত দেওয়ালে ওর মাথা ঠুকে দিল বারবার | জোর করে ওকে ঘরে আটকে দিল ওর বাবা দাদা | সমস্ত দিন চলল অত্যাচার | সারা দিন সারা রাত মেয়েটির কপালে একটা দানাও জুটল না | রক্তকে গাঢ় করে দুই চোখের জলে ভিজে গেল সমস্ত শরীর | আমরা জানতাম সব কিছুই | ও মাঝে লুকিয়ে ফোন করে আমাদের সব বলছিল | কিন্তু এত দূর থেকে কিছু করতে আমরা সত্যিই অপারগ ছিলাম | তার উপর পরের দিন ২৬ কিমি |

রিমির জন্য সে দিন রাতে ঠিক করে ঘুমাতে পারিনি | বারবার ওর কথাই উঠেছে আমাদের মধ্যে | সকাল ৮ টায় পদযাত্রা শুরু | কিন্তু রিমি থাকবে না ! কেমন যেন মেনে নিতে কষ্ট হচ্ছিল | অমানুষদের সাথে লড়াইতে মানুষ থাকবে না ! চোখের নির্ভেজাল ভালোবাসার জল থাকবে না ! তবে কান্নায় কান্নায় ঢেউ উঠবে কি করে ? মানুষ জিতবে কি করে ? মহীরুহ জিতবে কি করে ?

সকাল আটটা তিরিশ | আমাদের পদযাত্রা প্রায় শুরু | রিমি বাস থেকে নেমে এক ছুটে পদযাত্রায় পা দিল | ওর গলায় ঝুলল একটা লাইন ,”ভয় পেও না মহীরুহ , আমরা আছি তোমার লোক |” রিমিকে দেখে আবার মন শান্ত হল | এবার ২৬ কিমি কেন ২৬ আলোকবর্ষও হাঁটতে পারি |

সমস্ত রাস্তা জুড়ে আমি রিমিকে বারবার দেখেছি আর মুগ্ধ হয়েছি | মেয়েটি একদিন ধরে না খেয়ে আছে , তবু হাসি মুখে হেঁটে যাচ্ছে , শাওনের গানের সাথে সুর মিলিয়ে যাচ্ছে , স্লোগানে স্লোগানে ভরিয়ে যাচ্ছে রাস্তার দুই ধার | এক বিন্দুও ক্লান্তি নেই , নিজের যন্ত্রণাকে ছড়িয়ে দেওয়ার কোন ইচ্ছাই নেই |

শেষ চার কিমি আমি যখন আর হাঁটতে পারছিলাম না , ভাঙা রাস্তার খোয়া গুলি যখন আমার পায়ের পাতা ভেদ করে ঢুকে যাচ্ছিল গভীরে আর ব্যথায় ব্যথায় সমস্ত শরীর কেঁদে উঠছিল, আমি কেমন যেন হাল ছেড়ে দিচ্ছিলাম | তখনই রিমিকে দেখে নিজের কাছে নিজেকে ছোট লাগছিল | এই মেয়েটির ব্যথার কাছে আমার ব্যথা তো কিছুই না | আবার কেমন যেন জোর পাচ্ছিলাম।

পদযাত্রা শেষে বসিরহাটে পথসভাতে রিমির হাতে যখন মাইক্রোফোন তুলে দিল কল্লোল দা , কেমন যেন রোমাঞ্চিত হয়ে উঠলাম। পৃথিবীর প্রথম মাইক্রোফোনটি যেন ওর জন্যই তৈরি হয়েছিল | তারপর ওর সারল্য যখন লাউডস্পিকারে ঝরে পড়ল | সমস্ত বসিরহাট যেন স্তব্ধ হয়ে গেল | পথচলিত মানুষ , ভ্যান , টোটো , বাস , সব কিছু মূহুর্তে থেমে এলো | প্রতিটি বাক্য করতালিত হল , প্রতিটি অনুভূতি আমাদের চোখকে বার বার ভিজিয়ে দিল | ওর বলা কথাগুলি এক দিন পরও আমায় শিহরিত করছে | আমি কেমন যেন আর টাইপ করতে পারছি না |

রিমি আমাদের বলে গেল ,”আমরা ছোটরা বুঝতে পারছি গাছের ব্যথা , নীরবে সভ্যতার কেঁদে যাওয়ার কথা , তোমরা বড়রা কেন বুঝতে পারছ না , কেন শুনতে পারছ না |”

রিমি আজ বাড়ি ফিরে গেছে | ওর জন্য একটা নরক যেন হা হয়ে আছে | ওকে যেতে দিতে ইচ্ছে করছিল না | কিন্তু আটকে রাখব কোন অধিকারে কোন সম্পর্কে ? ও যদি আমার বোন হতো ? আমার মা ? আমার মেয়ে ? কিংবা আমার প্রেমিকা বা বউ ? বিশ্বাস করুন যে কোন একটা সম্পর্কে ওকে আমার কাছে আমাদের কাছে বেঁধে রাখতে পারলে আমি বেঁচে যেতাম। গাছগুলির মত নিজেকে বড় অসহায় লাগছে | এক সর্বগ্রাসী অবক্ষয় আমাদের শেষ পর্যন্ত বাঁচতে দেবে তো ? মানুষ হেরে যাবে না তো ? মহীরুহ হেরে যাবে না তো ? হেরে যাবে না তো সভ্যতা ? আর আমার রিমি ?

রিমি কিন্তু আজও তার লড়াই জারি রেখেছে , “একটি গাছও কাটতে দেব না |”
26th Sept , 2019

Advertisements