– তাপস বিশ্বাস
পরিবেশবান্ধব মঞ্চ বারাকপুর , উত্তর ২৪ পরগনা

‘সময় থাকিতে তোমরা এই সংকট নিবারণের জন্য কিছু কর নাই কেন?’ – শিশুদের এই প্রশ্নের সম্মুখীন সমাজবিদ, শিক্ষাবিদ, অর্থনীতিবিদ, রাজনীতিবিদ থেকে শুরু করে সমাজের সকল স্তরের নাগরিকদের যেমন হতে হবে। ঠিক তেমনই অভিযোগের তীর নিক্ষেপিত হবে রাষ্ট্রের আইনসভা, আদালত, পুলিশ, প্রশাসন এবং সংবাদ মাধ্যমের প্রতি। কারণ এই ভয়ংকর সংকটের জন্য কোনো না কোনো ভাবে কম বেশি আমরা সবাই দায়ি।

বড়দের অথবা এভাবে বলা যায় যে দেশ, সমাজ এমনকি পরিবারের অভিভাবকদের প্রকৃতি ও পরিবেশ সম্পর্কে চরম ঔদাসীন্যের প্রতিফল ও প্রতিবাদ স্বরূপ দিকে দিকে শিশু কিশোর ও তরুনদের এমনভাবে আন্দোলনে পথে নামা। একথা সত্য যে সুইডেনের বালিকা গ্রেটা থুনবার্গ তাহাদের এক বড় অনুপ্রেরণা। কারণ বিশ্বব্যাপী সকল সংবাদ মাধ্যমের কল্যাণে সে আজ সারা বিশ্ববাসির কাছে এক পরিচিত নাম। তার মানে এটা নয় যে সেই প্রথম প্রতিবাদী। তার আগে ও পরে অনেক অচিনপুরেও অনেক শিশু কিশোরেরা প্রকৃতি ও পরিবেশ রক্ষার্থে এমনই প্রতিবাদ করেছে এবং করে চলেছে। বহুলাংশেই তারা প্রচারের আলো থেকে বঞ্চিত হয়। তাই তাদের কথা কেউ জানতে পারে না। গ্রাম ভারতবর্ষ থেকেও এমন অনেক প্রশ্ন উঠে আসে যা যথাযথ প্রচারিত হলে আন্দোলনের তীব্রতা আরও গতি পেত।

আমি একমাত্র সংবাদ মাধ্যমকে দোষারোপ করতে চাইছি না। একথা সত্য যে এ পোড়া দেশের সাধারণ মানুষ এ বিষয়ে যথেষ্ট সজাগ ও সচেতন নয়। তারা মাঝেমধ্যে ভোটদান করেই সকল কর্তব্য পালন করে থাকেন। দীর্ঘদিন আপন স্বার্থ সিদ্ধির পিছনে ধাওয়া করতে করতে কোনো বিষয়ের তাৎক্ষণিক প্রভাবকেই বেশি গুরুত্ব দিয়ে থাকেন। দীর্ঘকালীন প্রভাবের ভাবনার অবকাশ তাদের কাছে সময় নষ্ট করা ছাড়া আর কিছুই নয়। এই কারণে পরিবেশ সংকটের ভয়ংকর বিপদ সম্বন্ধে সে উদাসীন। তবুও সব সময়েই কিছু মানুষ সময়ের গন্ডির বাহিরে দৃষ্টিপাত করে থাকেন এবং আগামীর বিপদে শঙ্কিত হন। চেষ্টা করেন সকলের দরজায় কড়া নেড়ে বিপদের আগাম সংবাদ দিয়ে সচেতন করতে। ছোট বড় সকল বয়সের এমন কিছু মানুষ যখন স্রোতের বিপরীতে হেঁটে পুলিশ, প্রশাসন, আম নাগরিক এমনকি যথেষ্ট প্রমাণের অভাবে আদালতের কাছেও সুবিচার পান না, দ্বারস্থ হন সংবাদ মাধ্যমের। যতই কর্পোরেট দ্বারা পরিচালিত হোক সাধারণ মানুষ এখনও আস্থা রাখেন গণতন্ত্রের এই চতুর্থ স্তম্ভের উপর। তারা বিশ্বাস করেন যে, কোনো অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ হোক বা সারা বিশ্বব্যাপী পরিবেশ সংকট হোক এ বিশ্বকে একই সূত্রে গেঁথে আন্দোলনে তীব্রতা আনতে পারে একমাত্র সংবাদমাধ্যম। এখন প্রশ্ন এ বিষয়ে সকল সংবাদ মাধ্যম যথেষ্ট সক্রিয় কি? দিনের পর দিন দেখে আসছি অতি সাধারণ বিষয় নিয়েও বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে এবং বিশেষ করে অডিও ভিসুয়াল সংবাদমাধ্যমে, বিতর্ক সভা আয়োজন করা হচ্ছে। প্রকৃতি ও পরিবেশ নিয়ে কটা বিতর্কের আয়োজন করা হয়েছে?

পরিশেষে আমার প্রতিবেশী সাত বছরের একটি মেয়ের তার মাকে করা একটি প্রশ্নের কথা আপনার পাঠক পাঠিকাদের কাছে রাখতে চাই। বারাকপুরের চন্দনপুকুর বাজার নিকটবর্তী বটতলা নিবাসী দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্রী সাত বছর বয়সী আনন্দিতা মুখার্জি ওরফে মোহরের বড় হয়ে ওঠা একটি কৃষ্ণচূড়া গাছের সাথে। একদিন সে দেখল রাস্তার দু ধারের সব গাছ কাটা হচ্ছে। বন্ধু কৃষ্ণচূড়ার প্রাণহানির আশঙ্কায় সে নিজের হাতে “আমি তোমাদের বন্ধু, আমাকে মেরো না” পোষ্টার এঁকে গাছের গায়ে আটকে দিল। আর প্রশ্ন করল তার মাকে “বইতে যে লেখা আছে save trees, they are our greatest friends?” আর স্কুলে ম্যাম যে বলেন “plant five trees before cutting one down” তাহলে কাকুরা কেন গাছগুলো কাটবে?” মোহরের এই প্রশ্ন উন্নয়নের মোড়কে প্রাকৃতিক সম্পদ ধ্বংসের বিরুদ্ধে যতটা, ঠিক ততটাই আমাদের প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থার বিরুদ্ধে। যে শিক্ষা পুস্তক ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে দেওয়া হয় বাস্তব জীবনে ঘটে তার বিপরীত। কী জবাব দেবেন তার মা? আর ছাত্রছাত্রীদের এমন প্রশ্নের কী জবাবই বা দেবেন শিক্ষক শিক্ষিকাগণ?

সুদূর সুইডেন নিবাসী ১৭ বছর বয়সি গ্রেটা থুনবার্গ এবং ভারতবর্ষের এক অঙ্গ রাজ্যের অধিবাসী ৭ বছরের মোহরের প্রশ্ন কি এক এবং অভিন্ন নয়? একজন প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থার অসাড়তা নিয়ে প্রশ্ন তুলে স্কুল বয়কট করার ডাক দিয়েছে। আর একজন শিক্ষালব্ধ জ্ঞান ও তার বাস্তবে প্রয়োগের বৈপরীত্য দেখে বিস্ময় প্রকাশ করেছে। গ্রেটা ও মোহর কেউ কাউকে চেনে না, জানেও না। তবুও পৃথিবীর দুই ভিন্ন প্রান্তের এই দুই অল্প বয়সির প্রতিবাদের কারণ ও ভাবনা অভিন্ন। সারা পৃথিবী জুড়ে বিক্ষিপ্ত এবং বিচ্ছিন্নভাবে এমন প্রতিবাদীরা সংখ্যায় অনেক। শুধু প্রয়োজন তাদেরকে বোঝার, তাদের আশংকার প্রাসঙ্গিকতাকে অনুধাবন করে এই আন্দোলনকে সংগঠিত করার। এবং এই কাজটি বিশ্বের সকল নাগরিক ও সকল প্রতিষ্ঠানকে সংঘবদ্ধভাবে করতে হবে। আর ঠিক এইখানে সংবাদমাধ্যমের গুরুত্ব অপরিসীম।

Advertisements