রাহুলদেব বিশ্বাস

প্রশ্ন : The Green Wall : সবুজ প্রাচীর আসলে কী ?

উত্তর : The Green Wall : সবুজ প্রাচীর হলো ভারতবর্ষের পশ্চিমবঙ্গে প্রস্তাবিত গাছেদের প্রাচীর | এটি সমগ্র পশ্চিমবঙ্গের পশ্চিম দিক থেকে পূর্ব দিকে বিস্তৃত থাকবে | এর প্রস্থ হবে বঙ্গোপসাগর ও রাজ্যের ভূমিভাগের শেষ সীমা থেকে শুরু করে ১৫০ কিমি উত্তর পর্যন্ত বিস্তৃত | প্রস্তাবিত গাছের প্রাচীরটি হবে নদ-নদী খাল বিল সমন্বিত | রাজ্যের পূর্ব মেদিনীপুর , হাওড়া , হুগলী , কলকাতা , উত্তর ২৪ পরগনা , দক্ষিণ ২৪ পরগনা জুড়ে এটি বিস্তৃত হবে |

প্রশ্ন : The Green Wall : সবুজ প্রাচীর পরিকল্পনা কেন নিতে হচ্ছে ?

উত্তর : বিশ্ব উষ্ণায়ণের ফলে পৃথিবীর অন্যান্য সমুদ্রতীরবর্তী অঞ্চলগুলোর মতো পশ্চিমবঙ্গের ভূমিভাগ সমুদ্রতলে লোপ পাচ্ছে এটি সর্বজনবিদিত | আমরা এর প্রমানও পাচ্ছি ; পূর্বাশা , লোহাচোরার মত দ্বীপ চিরতরে হারিয়ে যাওয়া এর সত্যতা প্রমানে যথেষ্ট | আবার ঘোড়ামারা , সাগরদ্বীপসহ সুন্দরবনের বিস্তীর্ণ ভূভাগ ধীরে ধীরে কমতে থাকাও একই ঈঙ্গিত দিচ্ছে | বিতর্ক থাকলেও অনেক বিশেষজ্ঞেরই মত 2050 সালের মধ্যে রাজ্যের ১৭% ভূভাগ জলের তলায় থাকবে ; অর্থাৎ দক্ষিণের ছয়টি জেলা চিরতরে মিলিয়ে যাবে | তার সাথে তৎকালীন প্রায় ছয়কোটি বাঙালি বাস্তুহারা হবে |

অন্যান্য সমস্যাগুলোকে হিসাবের ভিতর ধরলে এই প্রক্রিয়া আরো দ্রুত ও ভয়ঙ্কর হওয়ার কথা | যেমন ধরা যাক , গাঙ্গেয় বদ্বীপ আর তরুণী অবস্থায় নেই ; বয়োপ্রাপ্তি ঘটেছে | এর দুটি কারণ |

এক | গঙ্গা ও তৎসহ অন্যান্য নদীতে শত শত বাঁধ দেওয়ার ফলে , খাল কাটার ফলে গাঙ্গেয় ব-দ্বীপ আর আগের মতো জল পাচ্ছে না ; সাথে বৃষ্টির জলকে ধরে রাখার খাল বিলগুলো দখলদারির জন্য প্রায় অবলুপ্তির পথে | ফলে মাটির নীচের ভৌমজলের ভাঁড়ারও শূন্যের দিকে | যে ভৌমজল প্লবতার স্বাভাবিক সূত্রে গাঙ্গেয় ব-দ্বীপকে ভাসিয়ে রাখছিল , এখন প্রতিদিন তা আর সম্ভব হচ্ছে না , ধীরে ধীরে গাঙ্গেয় ব-দ্বীপ নীচের দিকে নামছে |

দুই | বাঁধ ও খালগুলির জন্য যেমন গাঙ্গেয় বদ্বীপ জল পাচ্ছে না , তার সাথে আর পলিও পাচ্ছে না | এতোদিন প্রতিনিয়ত যে পলি পেয়ে দ্বীপের স্বাভাবিক ক্ষয়কে অতিক্রম করে দ্বীপ আরো সমৃদ্ধ হত , এখন আর সে উপায় নেই ; দ্বীপগুলির শুধু ক্ষয়প্রাপ্তিই ঘটছে |

একদিকে বিশ্ব উষ্ণায়ণের ফলে বাড়তে থাকা সমুদ্র জলের সাথে এই দুটি কারন যুক্ত হয়ে আমাদের সাধের পশ্চিমবঙ্গ ধ্বংসের মুখোমুখি | প্রকৃতির এই নির্দয় রোষ থেকে বাঁচতে মানুষের সকল প্রযুক্তিই ব্যর্থ হবে ; প্রকৃতির এই নির্দয়তার হাতে থাকে আমাদের বাঁচাতে পারে প্রকৃতিই | প্রকৃতির শ্রেষ্ঠ আশির্বাদ গাছ | গাছের পরিকল্পিত একটি প্রাচীর | তাই The Green Wall : সবুজ প্রাচীরের পরিকল্পনা নেওয়া |

প্রশ্ন : সবুজ প্রাচীর কি ভাবে পশ্চিমবঙ্গকে বাঁচাবে ?

উত্তর : সবুজ প্রাচীরের গাছ তার স্বাভাবিক সালোকসংশ্লেষের মাধ্যমেই বাংলা তথা পৃথিবীকে বাঁচাতে পারে |

6 CO2 + 12 H2O +photons ➔ C6H12O6 + 6 O2 + 6 H2O

(carbon dioxide + water + light energy ➔ glucose + oxygen + water).

এক : বিশ্ব উষ্ণায়ণে লাগামের মাধ্যমে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধিতে লাগাম

co2 শোষণ ও তাকে কার্বোহাইড্রেট রূপান্তরিত করে নিজের শরীরে অঙ্গীভূত করার মাধ্যমে পৃথিবীতে গ্রীনহাউস গ্যাসের চাপ কমিয়ে উষ্ণতায় লাগাম পরানো যেতে পারে | উষ্ণতায় লাগাম পরানো গেলের সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধিতেও লাগাম পরানো যেতে পারে |

দুই : মাটির পরিমান বৃদ্ধি :

বাঁধের কারনে যে পলি গাঙ্গেয় ব-দ্বীপ আসতে পারছে না , তাকে লরি ভরে আনা সম্ভব নয় | রাজ্যের দূষণ নিয়ন্ত্রন পর্ষদে সভাপতি কল্যান রুদ্র একবার আলাপচারিতায় উল্লেখ করেছিলেন ; ফারাক্কার বাঁধে যে পলি জমা আছে তা লরি ভরে গাঙ্গেয় ব-দ্বীপে আনতে গেলে , যতগুলি লরি লাগবে সেগুলিকে পর পর দাঁড় করিয়ে দিলে পৃথিবীর নিরক্ষ রেখাকে ১২৫ বার আবর্তন করবে | তাহলে গাঙ্গেয় ব-দ্বীপকে স্বাভাবিকভাবে সমৃদ্ধ করা কিভাবে সম্ভব ? সম্ভব একমাত্র The Green Wall : সবুজ প্রাচীরের সুপরিকল্পিত গাছের সালোকসংশ্লেষের মাধ্যমে | গাছ বাতাস থেকে ছয় অনু কার্বনডাইঅক্সাইড নিয়ে এক অনু কার্বোহাইড্রেট তৈরি করে নিজের দেহে অঙ্গীভূত করার মাধ্যমে আসলে ভূমির পরিমান , ভূমির জৈব ভর বৃদ্ধি করে যাচ্ছে প্রতি মুহূর্তে | সবুজ প্রাচীরের গাছের প্রতিনিয়ত জৈব ভরের বৃদ্ধি করাই নদীর পলির মাধ্যমে মাটির পরিমান বৃদ্ধির বিকল্প হতে পারে | যা পশ্চিমবঙ্গকে সমুদ্রের জলে তলিয়ে যাওয়া থেকে রক্ষা করবে |

তিন : সবুজ প্রাচীরের অরণ্য বিশ্ব উষ্ণায়ণের বরফ গলা অতিরিক্ত জলের সঞ্চয় হতে পারে

গাছ সালোকসংশ্লেষে ১২ অণু জল নিয়ে এক অণু কার্বোহাইড্রেট উৎপন্ন করে ও ৬ অণু জল আবার ফিরিয়ে দেয় | অর্থাৎ এক অণু কার্বোহাইড্রেট তৈরিতেই সে ৬ অণু জলকে সঞ্চয়ক হিসাবে চিহ্নিত করা যেতে পারে | সবুজ প্রাচীরের বিপুল গাছ এই ভাবে বরফগলা অতিরিক্ত জলের সঞ্চয়ও করতে পারে | এই প্রক্রিয়ায় স্থলভাগে মিষ্টি জলের জোগান বৃদ্ধি পাবে , জল সংকটকে রুখে দেওয়া যাবে |

এছাড়া এই পদ্ধতিতে যেমন বিস্তীর্ণ অঞ্চলের বন্যা নিয়ন্ত্রণ সম্ভব , তেমনি খরার মরসুমে মাটিকে অধিক আর্দ্র রাখা সম্ভব , নদীগুলোতে সমস্ত বছর জলের জোগান রাখা সম্ভব |

প্রশ্ন : The Green Wall : সবুজ প্রাচীরের মতো এতো বড় পরিকল্পনা কিভাবে বাস্তবায়িত করার কথা ভাবা হয়েছে ও হচ্ছে ?

উত্তর : এটি এই সময়ে দাঁড়িয়ে সবচেয়ে বড় সবচেয়ে জটিল প্রোজেক্ট হতে চলেছে , যা চীনের মহাপ্রাচীর বাস্তবায়িত করা থেকেও কঠিন ও জটিল | কিন্তু এটি আমাদের করতেই হবে ; না হলে পশ্চিমবঙ্গের ছয় কোটি বাঙালী বাস্তুহারা হবে | পশ্চিমবঙ্গের এই প্রজন্মের অনেক তরুণের পূর্বপুরুষ পূর্ববঙ্গ থেকে বাস্তুহারা হয়ে পশ্চিমবঙ্গে আসতে বাধ্য হয়েছিল | এইবার অবস্থা আরো সঙ্গীন হতে চলেছে ; কোন বাঙলাই অবশিষ্ট থাকবে না | আমাদের কারো কারো পূর্বপুরুষ বাস্তুহারা ছিল , আমরা আমাদের একজন উত্তরপুরুষকেও বাস্তুহারা হতে দিতে পারি না | নবজাতকের জন্য শুধুই নোনাজল রেখে যাওয়ার মতো নপুংসক হিসাবে ইতিহাসে নিজেদের নাম লিখে যেতে চাই না | তাই যেকোন মূল্যেই The Green Wall : সবুজ প্রাচীর আমরা করে যাবই |

আমরা এরজন্য The Green Wall : সবুজ প্রাচীর Executive Body গঠন করছি |

* Executive Body তে যারা সদস্য থাকবে :

১) সাতজন ব্যক্তি

২) এই ছয়জেলার প্রতিটি সংগঠন , ক্লাব , সমিতি , স্কুল , কলেজ , বিশ্ববিদ্যালয়কে Body এর সদস্য হতে আমন্ত্রণপত্র পাঠানো হবে ; আগ্রহীদের Body তে অন্তর্ভূক্ত করা হবে | এঁরা *সাধারন সদস্য* |

৩) Body র আমন্ত্রিত সদস্য হতে রাজ্যের অন্য জেলাগুলির সকল সংগঠন , ক্লাব , সমিতি , স্কুল , কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়কে আমন্ত্রণ পত্র পাঠানো হবে | এরা *আমন্ত্রিত সদস্য* |

৪) পশ্চিমবঙ্গ সরকার ও ভারত সরকারকে observer হতে আমন্ত্রণ করা হবে |

Executive Body ঠিক করবে কিভাবে The Green Wall: সবুজ প্রাচীরকে বাস্তবায়িত করা যায় | অবশ্যই এর মধ্যে ছয়টি জেলার প্রকৃতির বর্তমান পরিস্থিতির তৃণমূলীয় স্তরের সার্ভে থেকে শুরু করে গাছ লাগানোর বিভিন্ন কৌশল , ছাদবাগান , ভার্টিকাল গার্ডেন , নদী-নালা খাল বিলকে সবুজ জলপ্রবাহ ও জলাশয়ে পরিনত করার মতো নানাবিধ পদ্ধতি অবলম্বন করা হবে |

প্রশ্ন : The Green Wall শুধুই কি পশ্চিমবঙ্গের জন্য ?

উত্তর : বাড়িতে যখন আগুন লাগে তখন শুধুমাত্র নিজের ঘরের আগুন নেভানো মূর্খামি | সবটাই নেভাতে হবে | The Green Wall এর শুরুটা পশ্চিমবঙ্গে | এরপর সব রাজ্যগুলি , দেশগুলিকে The Green Wall এ আমরা আহ্বান করব |

ধাপে ধাপে অবশ্যই বিস্তারিত জানা ও মত বিনিময়ের উপায়ও থাকবে | সবুজ প্রাচীরকে সাফল্যমণ্ডিত করতে গেলে চেতনার সবুজ প্রবাহ সর্বাগ্রে প্রয়োজন | যেকোন প্রশ্ন , সাজেশন , পজেটিভ-নেগেটিভ মন্তব্যকে ভালোবাসার সাথে আহ্বান করা হচ্ছে |

এই শতাব্দী সবুজ শতাব্দী

The Green Wall Committee
The Green Walk

Advertisements