– হিমু থুড়ি raহুল

রূপাকে প্রায়ই তার দোতলার ব্যালকনির জানালায় নীল শাড়ি পড়ে দাঁড়াতে বলি, কিন্তু কোনদিন তার বাড়ির সামনে যাওয়া হয়নি, আবার যেদিন গিয়েছি সেদিন রূপাকে জানানো হয়নি ; জানালার রেলিংগুলিকে নীল শাড়িতে দেখে খালি পায়ে হলুদ পাঞ্জাবিতে যশোর রোড ধরে বনগাঁ থেকে পেট্রোপল হয়ে ঢাকার রাজপথ |

সেদিন রূপার কাছে অবশেষে ধরা পড়ে গেলাম, নীল শাড়িতে ও নেমে এল যশোর রোডে | বনগাঁ এক নম্বর রেল গেট থেকে রূপার সাথে হাঁটছি | দুই দিকে গাছেদের অবশিষ্ট কঙ্কাল সূর্যের তেজ শুষে নিচ্ছে ; ২০১৭ তে রাজার হুকুমে গাছগুলি কাটা হয়েছিল | রূপার সমস্ত শরীর দিয়ে নোনা জলের নদী বইছে, আর ওর শরীরের পারিজাত সুগন্ধির নেশাতুর ছায়া আমাকে নিয়ে চলেছে স্বপ্নের দেশে | স্বপ্ন ভেঙে গেল ওর মুখের ঝালে, “হিমু তুমি মিথ্যাবাদী | তুমি সবাইকে বল, তুমি যখন খালি পায়ে হলুদ পাঞ্জাবিতে হাঁটো – রাত হোক কী দিন, মাটিতে চাঁদ নেমে আসবেই |” আমি কিছু বলি না শুধু ডান হাতটা ওর দিকে এগিয়ে দিই ওর বাম হাতের দিকে, আর আমরা একসাথে পা দিই যশোর রোডের মহিরুহদের খুলিগুহায় | সাথে সাথে সূর্য নেমে যায় – চাঁদ ওঠে |

রূপা এখন হাঁটছে | যশোর রোডের প্রাচীন বৃক্ষরাজি তাদের কুলোবধূকে প্রথমবারের মত পেয়ে স্নেহে আদরে উজাড় করে দিচ্ছে | রূপা তবু হাল ছাড়ার পাত্রী নয়, সোহাগের আবেশে বলে, “হিমু তুমি তাও মিথ্যাবাদী | তুমি সবাইকে বল, তোমার সাথে গাছেরা কথা বলে, গাছেরা তোমাকে সাড়া দেয়, তাদের সব অনুভূতিগুলি বুঝতে পার |” আমি কোন উত্তর দিই না, শুধু ওকে দেখতে থাকি, যে দেখার কোনো বিরাম নেই, কোনো অন্ত নেই | “ছাড় বুঝে গেছি তুমি মিথ্যাবাদী, তুমি যশোর রোডের আন্দোলনের কথা বল শুনি |” রূপা, গল্পটার শুরু রাজস্থানে | ভারতের মরুভূমি প্রদেশ রাজস্থান | থর মরুভূমি জীবনকে নিংড়ে নিতে চায়, জীবন প্রায় অসম্ভব, সেই অসম্ভবকে সম্ভব করতে জন্ম নিল “খেজরি”, বাবলাজাতীয় কাঁটা গাছ | খেজরি পাতাল থেকে জলকে তুলে এনে মানুষ বসবাসের উপযুক্ত একটি গ্রাম গড়ে তুলল, খেজরির সৃষ্ট গ্রাম, তাই গ্রামটির নাম খেজরালি |

সালটি ১৭৩০ | মাড়োয়ার রাজা অভয় সিং তার নতুন প্রাসাদ গড়ে তোলার কাঠের জোগান মেটাতে খেজরালির খেজুরি গাছ কাটার নির্দেশ দিল | গ্রামটির বিষ্ণোই সম্প্রদায়ের মানুষ জানতেন খেজরি গাছগুলি আছে বলে খেজরালি আছে, না হলে থর মরুভূমি সব কিছু গ্রাস করে নেবে |ফলে তারা এর প্রতিবাদ জানান | অমৃতা দেবীর নেতৃত্বে গ্রামবাসী গাছগুলিকে জড়িয়ে ধরেন কাটতে দেবেন না বলে | রাজার সেনাদের হাতে ৩৬৩ জন মানুষ খুন হন, তবু তারা গাছগুলিকে আঁকড়ে ধরে থাকেন | অবশেষে রাজা তার ভুল বুঝতে পারেন, বেঁচে যায় খেজরি আর খেজরালি |

রূপা চা খাবে ? “না আমাকে কি তুমি চা খোড় পেয়েছ ? চা খেতে খেতে তো ঠোঁট দুটিকে রাতের অন্ধকারের মত করে তুলেছ | ok খাও তুমি চা, আমি অন্তত একটা গাছকে মন দিয়ে স্থির হয়ে দেখি |” মাটির ভাঁড়ে চায়ের ধোঁয়ার আড়ালে আমি লুকিয়ে লুকিয়ে রূপাকে দেখছি আর রূপা গাছগুলোকে – দুইজনের দৃষ্টিই অপলক | চায়ের কাপের শেষ চুমুটা রূপা কেড়ে নিল, আবার হাঁটা শুরুর আগে ডাস্টবিনে চায়ের কাপটাকে অভিমানের সাথে একবার দেখলাম- চায়ের কাপটাতে এখনও রূপার চুমুটা লেগে আছে গোলাপের পাপড়িগুলো যেভাবে লেগে থাকে নববধুর ফুলশয্যার বিছানার চাদরে |

রূপা হাঁটতে হাঁটতে আবার মুখ ঝামটা দেয়, “ফাঁকিবাজ আমাকে না দেখে গল্পটা বলো |” দেশ তখন স্বাধীন হয়নি | দুই বাংলা এক বাংলা | পূর্ব বাংলা সুজলা সুফলা শস্য শ্যামলা আর পশ্চিমবাংলা একেবারে মরুভূমির দেশ, উষ্ণ, শুষ্ক আর রুক্ষ | ১৭৭৬ সালে দেখা মন্বন্তর | চারিদিকে খরা আর খরা | ফসল সব শুকিয়ে যায় | পশ্চিমবাংলা শ্মশান হওয়ার অবস্থায় | বাংলার উদ্ভিদবিদরা খুব চিন্তা শুরু করেন, এই অবস্থার পরিবর্তনের জন্য | শিবপুর বোটানিকাল গার্ডেন অগ্রনী ভূমিকা নেয় | বিদেশ থেকে পশ্চিমবাংলার উপযোগী মেহগনি, শিরিষ জাতীয় গাছ নিয়ে আসেন | ধীরে ধীরে সেই গাছগুলিকে ছড়িয়ে দেওয়া হয় বাংলার সমস্ত রাস্তার দুই পাশে, সর্বত্র |

মেহগনি, শিরিষ জাতীয় মহিরুহ পাতাল থেকে জল টেনে উপরে তুলে আনে | পরিবেশকে চাষবাসের ও বাস্তুতন্ত্র সৃষ্টি ও রক্ষার বাতাবরণ গড়ে তোলে | গাছ যত বড় হতে থাকে, খরা তত কমতে থাকে, মন্বন্তর তত | ধীরে ধীরে দুই বাংলার পরিবেশ একই সাম্যে আসে | বাংলা আবার সুজলা সুফলা শস্য শ্যামলা | অর্থাৎ বাংলা জুড়ে যে রাস্তাগুলি তখন তৈরি হয় সেই রাস্তা ধরেই সোনার বাংলা ঘরে ফেরে |

সোনার বাংলার একটি গুরুত্বপূর্ণ রাস্তা, আজকের যশোর রোড | যশোর রোডের ইতিহাস তার দুই শতাব্দী প্রাচীন মহিরুহদের মতই রহস্যময় ও বহুমাত্রিক | এই রাস্তাটি একবারে, একই সময়ে কেউ গড়ে তোলেননি | গাছগুলিও তাই |

ষোড়শ শতাব্দীতে ভারতবর্ষের সম্রাট পূর্ববঙ্গের সোনার গাঁ থেকে সিন্ধুপ্রদেশ পর্যন্ত তিন হাজার মাইল গ্রান্ড ট্রাঙ্ক রোড নির্মাণ করেছিলেন, তার দুই পাশে গাছ | বাংলাদেশের যশোর রোডের সম্পূর্ণটা আর পশ্চিমবঙ্গের কিছুটা এই গ্রান্ড ট্রাঙ্ক রোডের অংশ |

সুলতান মাহমুদে শাহের রাজত্বকালে যশোর জয় জয় করার জন্য, “গৌড়বঙ্গ রোড”কে যশোরে নিয়ে যান | ফলে বাংলাদেশের দিকের যশোর রোড কিছুটা “গৌড়বঙ্গ রোড” এর অংশ ছিল |

যশোর শহরের নিকটবর্তী বকচরা গ্রামের জমিদার ছিলেন কালীপ্রসন্ন পোদ্দার | মায়ের আদেশে তিনি বকচরা থেকে নদীয়ার চাকদাহ র গঙ্গাতীর পর্যন্ত ৫০ মাইল দীর্ঘ রাস্তা করেন, তার দুই দিকে লাগান অনেক শিরিষ মেহগনি জাতীয় গাছ | যা কালী পোদ্দারের রাস্তা নামেও পরিচিত | অর্থাৎ বাংলাদেশের যশোরের বকচরা থেকে পশ্চিমবঙ্গের বনগাঁ পর্যন্ত কালী পোদ্দারের রাস্তা আজকের দিনের যশোর রোডের অংশ |

বনগাঁ থেকে কলকাতার শ্যামবাজার পর্যন্ত যশোর রোডের বাকি অংশ নির্মান করে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি | গাছগুলিও তারাই লাগান |

ধীরে যশোর রোড আর তার গাছগুলি সমগ্র এলাকার লাইফলাইন হয়ে উঠে | একদিকে গাছগুলি বাস্ততন্ত্রকে সমৃদ্ধ ও সুসংহত করে চাষবাস ও মানুষের বসবাসের উপযুক্ত হয় এলাকাটি, সাথে রাস্তাটি মানুষের যাতায়াতের অন্যতম মাধ্যম হয়ে ওঠে | তার সাথে রাস্তাটিকে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, বব ডিলানের গান, বিভূতিভূষণ বন্দোপাধ্যায়ের আরণ্যক উপলব্ধি আরো সমৃদ্ধ করে তোলে |

রূপা হাঁটতে হাঁটতে এক প্রপিতামহ মহিরুহের সামনে থমকে যায় | এত বিশাল এত রহস্যময় এত মঙ্গলময় কারো সাথে ওর প্রথম দেখা | বিপুল ভীম বৃক্ষরাজ মুহূর্তে বিশ্বময় অনন্তযোজনব্যাপি হিমুতে রূপান্তরিত হয়ে যায়, হিমুর লক্ষ লক্ষ হাত দশদিকে ছড়িয়ে আছে, প্রত্যেকটি হাতে রূপার জন্য একটি করে নীলপদ্ম – আর যশোর রোডটা ময়ূরাক্ষী নদী | রূপা নিজের অস্তিত্ব হারিয়ে ফেলে, সে যেন এক বিরাট শতবর্ষীয় গাছ হয়ে উঠেছে, তার দুই ঠোঁট, ফর্সা গাল, কাজলে ঢাকা চোখ, বাতাসে উড়তে থাকা খোলা চুল, হাতপায়ের আঙুলের মৃদু কম্পন আমি গোগ্রাসে গিলছি | রূপারা জানে না যে হিমুরা কখনো মিথ্যা বলে না, হিমুদের কাছে গাছেরা, নদীরা চিরদিন এইভাবে ধরা দিয়ে এসেছে, আর দেবেও যতদিন ময়ূরাক্ষী নদীটা বয়ে যাবে |

“হিমু গল্পটা শেষ করো |” সালটি ২০১৭, রাজার ইচ্ছা হয় যে গাছগুলি বাংলাকে খরা থেকে ফিরিয়ে এনেছে মন্বন্তর থেকে ফিরিয়ে এনেছে, সে গুলিকে কেটে উড়ন্ত রাস্তা হবে | মানুষ বুঝতে পারে উড়ন্ত রাস্তাটি আবার উড়িয়ে নিয়ে যাবে তাদের মন্বন্তরে | কবিরা কলম ধরে, স্কুল কলেজের ছেলে মেয়েরা ফেসবুক whatsapp, যুবক যুবতী গাছকে জড়িয়ে ধরে, মেয়েরা তাদের ছেলেদের মেয়েদের স্বামীদের পাঠিয়ে দেয় ভালোবাসার সবুজ মিছিলে, ”গাছ বাঁচিয়ে রাস্তা হোক”, গিটার হাতে গায়করা আর তুলি হাতে শিল্পী রা নেমে পরে রাস্তায়, সাংবাদিকরা মুহূর্তে সবুজ সাংবাদিক, আর আমরা প্রত্যেকে এক একটি গাছ |

“তাহলে হিমু তোমরা জিতে গেলে ?” না রূপা আমরা তো হেরেছি | আমরা রাস্তায় নেমেছিলাম কিন্তু কেউ গাছের জন্য নামিনি, কেউ নেমেছি “পরিবেশ আন্দোলন” করব বলে, কেউ নেমেছি “বামপন্থী বা ডানপন্থী আন্দোলন” করব বলে, কেউ নেমেছি আরো আরো অনেক অনেক কারনে | আমরা কেউ গাছ চাইনি – আমাদের কাছে আমাদের ‘ব্যক্তি আমি’রা বড় হয়ে উঠেছি, বড় হয়ে উঠেছে আমাদের “বন্দী ধারনা” গুলো | তাই প্রতিদিন আমরা হেরে যাচ্ছি, আর একটি করে গাছ হারিয়ে যাচ্ছে | রাস্তার পাশের মানুষগুলো কেউ গাছ চায় না, তারা সবাই চায় গাছগুলো যেভাবেই হোক মরে যাক | সমস্ত যশোর রোডটা “সলমন দ্বীপ” হয়ে গেছে | যেভাবে সলমন দ্বীপের উপজাতিরা গাছগুলিকে ঘিরে ধরে সবাই মিলে “তুই মর” বলে গাছ গুলিকে মাসান্তে মেরে ফেলে, সেই ভাবে “যশোর রোডের গাছ তুই মর” – এক একটা গাছ মরা লাশ |

রূপার বাম হাত থেকে আমার ডান হাতটা আলগা হয়ে যায়, সামনে একটা গাছের লাশ পড়ে আছে – ঠিক তখনই যশোর রোডের চাঁদটা নেমে গেল – রাগি সূর্যটা উঠল |

“রূপা একা জানালায়
এখনো জানে না সে হায়
হিমু আর কোনদিন কোনদিন
আসবে না…”

Advertisements