(২০জুলাই – ২১জুলাই চূর্ণী নদীর মোহনা থেকে উৎস ৭০ কিমি পায়ে হেঁটে যা জেনেছি, বুঝেছি ও অনুভব করেছি)

-রাহুলদেব বিশ্বাস
জল
http://www.thegreenwalk.com
The Green Walk
22.07.2019

চূর্ণী নদীর তীরের নদীয়া জেলার গ্রাম ; ভায়না গ্রাম | একটা দৃশ্য আমাদের চোখে আটকে গেল, কতগুলি বিভিন্ন বয়সের মহিলা ও ছোট মেয়ে একটা জলের ট্যাপের মুখে পাত্র নিয়ে বসে আছে, কখন জল আসবে ! ওদের দিনে একবার মাত্রই জল আসে, কিন্তু কখন আসবে তার ঠিক নেই | ওই জলটুকু যে ভাবেই হোক সংগ্রহ করা চাইই না হলে ওই দিন আর জল জুটবে না – পরের দিনের অনিশ্চিত মুহূর্তের জন্য অপেক্ষা করতে হবে | অথচ ভায়না গ্রামের কাছেই বয়ে চলেছে পশ্চিমবঙ্গের অন্যতম একটি সমৃদ্ধ নদী চূর্ণী | কিন্তু নদীর জলের এক ফোঁটাও ছোঁয়ার উপায় নেই তাদের – যে নদীর জল সমস্ত পৃথিবীর কাছে আশির্বাদ, ভায়নার মত গ্রামগুলির কাছে সেই নদীর জল অভিশাপ, নদীর জল খাওয়া তো দূরের কথা, জলে অন্যান্য কাজ করা ভয়ানক বিপজ্জনক – চূর্ণীর জল আপনাকে জীবন নয় মৃত্যুই দেবে |

চূর্ণী নদীর মোহনা পায়রাডাঙ্গার শিবপুর ঘাটের কাছে | এখানেই নদীটি হুগলী নদীর সাথে মিলিত হয়েছে | আর চূর্ণীর উৎস মাজদিয়ার পাবাখালি, পাবাখালিতে মাথাভাঙা থেকে দু’টি নদী উৎপত্তি হয়েছে, একটি দক্ষিণবাহিনী নদী ইছামতী, অন্যটি পশ্চিমবাহিনী নদী চূর্ণী | পায়রাডাঙ্গা থেকে পাবাখালি প্রায় ৭০ কিমি রাস্তায় মানুষের কাছ থেকে একটি ক্ষোভ উদ্গীরিত হতে দেখেছি তা হল – চূর্ণী নদীর বিষাক্ত জল | ‌চূর্ণীর নদীর জল এতটা বিষাক্ত যে নদীটি মাছের জন্য প্রায় অনুপযুক্ত হয়ে পড়েছে | দুই পাড়ের গ্রামগুলিতে একসময় প্রচুর মানুষেরই জীবিকা ছিল মাছ ধরা | এখন তারা বেশিরভাগই নিজেদের জীবিকা ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন, বাপ ঠাকুরদার পুরানো পেশা ছেড়ে চাষবাসে মন দিতে হচ্ছে, অনেকেই কল কারখানার শ্রমিকে পরিনত হয়েছে, বাকিরা জীবিকার খোঁজে অন্য রাজ্যে পাড়ি দিয়েছে |

চূর্ণীর নদীর জল বিষাক্ত কেন ?

বিষয়টি নিয়ে আমরা অনেকদিনই জানি, তাছাড়া আমাদের পদযাত্রায় দুইদিনই ছিলেন নদী বিশেষজ্ঞ অনুপ হালদার, তিনিও বিস্তারিত জানিয়েছেন | মানুষের ভিতর থেকেও একই প্রতিক্রিয়া উঠে এল | প্রতিবেশি দেশ বাংলাদেশের চুয়াডাঙ্গার দর্শণাতে এক বিখ্যাত মাদক কারখানা Carew & Co Ltd থেকে মারত্মক বিষাক্ত জল পরিস্রুত না হয়েই মাথাভাঙা নদীতে পড়ে | কেরু কারখানাতে আখ থেকে মদ তৈরি করার সময় উপজাত হিসাবে বিষাক্ত তরল উৎপন্ন হয় তাতে অনেক উপাদানের সাথে মাত্রাতিরিক্ত কার্বনেট, বাইকার্বনেট, নাইট্রেট ও ফসফেট পাওয়া যায় | এই উপাদানগুলিই জলকে বিষাক্ত করে তুলছে | শুধু জলেই বিষক্রিয়া সীমাবদ্ধ নেই, জল থেকে মাটিও দূষিত হয়ে পড়ছে | 2019 এ “যাদবপুর স্কুল অফ এনভায়রন্টমেনটাল স্টাডি” এর একটি গবেষণা চলছে, তাতে দেখা যাচ্ছে চূর্ণীর নদীর অববাহিকায় নদীয়ার একটা বিস্তৃর্ণ অঞ্চল থেকে যে শাক সব্জি, খাদ্য শস্য যেমন ধান গম, ডাল, ফল, ডিম, দুধ, মাংস পাওয়া যাচ্ছে তাতে মাত্রাতিরিক্ত ভয়ানক ক্ষতিকর নাইট্রেট পাওয়া যাচ্ছে | আমাদের The Green Walk এর নদী বিশেষজ্ঞ অনুপ হালদারের মতে এই নাইট্রেটের অনেকগুলি উৎস হতে পারে, তার মধ্যে অবশ্যই একটা চূর্ণীর নদীর বিষাক্ত জলও |

চূর্ণী নদীর জল নষ্ট হয়ে যাওয়ার আরো একটি বড় কারন রানাঘাট পৌরসভা | রানাঘাট পৌরসভার নর্দমার সমস্ত জল অপরিস্রুত হয়ে চূর্ণী নদীতেই পড়ে যা চূর্ণীর দূষণ আরো বাড়িয়ে দিচ্ছে | আর একটি ভয়ানক ক্ষতিকর দিক হল, রানাঘাট সংলগ্ন অঞ্চলে অনেক ছোট ছোট সুতা তৈরির কারখানা আছে, সুতা তৈরির সময় নানা রকম রাসায়নিক ব্যবহার করা হয় যা কোন রকম পরিস্রুত করার প্রক্রিয়া ছাড়াই নজরদারি ছাড়াই চূর্ণী নদীতে মেশে |

চূর্ণী নদীর জলের দূষণ মুক্ত করতে সরকারের কী ভূমিকা ?

Carew & Co Ltd তার ছাড়া জল পরিস্রুত করার বিষয়ে কোন পদক্ষেপই যে নিচ্ছে না তা স্থানীয়দের বক্তব্য থেকেই বোঝা যায় | স্থানীয়দের বক্তব্য জল পরিস্রুত করার জন্য ‘নমামী গঙ্গে’ থেকে ১৭.৫ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে দুই বছর আগেই | যদি স্থানীয়দের বক্তব্য সত্যি হয়, তাহলে ১৭.৫ কোটি টাকা কী হল এটা নিয়ে একটা প্রশ্ন তোলা হয়ত এই মুহূর্তে খুব দরকারি | নতুন একটা প্রতিশ্রুতি কিছু ব্যক্তি ফেসবুকে ছড়াচ্ছেন, তারা নাকি ১ কোটি টাকা কেন্দ্রীয় সরকার থেকে বরাদ্দ করিয়েছেন, দাবির সত্যটা জানতে কাজ শুরু হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে |

চূর্ণীর বিষ নিয়ে এতদিনে সামগ্রিক কোন আন্দোলন গড়ে উঠেছে কি ?

আমরা এতদিন সোসাল মিডিয়াতে জানতাম চূর্ণীকে নিয়ে বিরাট আন্দোলন হচ্ছে | এই দুই দিনে কিন্তু তার বিপরীত ছবিই মিলল | আমরা চূর্ণীর মোহনা থেকে উৎস অসংখ্য মানুষের সাথে কথা বলে জেনেছি, চূর্ণীর উৎস থেকে মোহনা সামগ্রিক কোন আন্দোলন তারা গড়ে তুলতে পারেননি, তবে প্রত্যেকের মনেই ক্ষোভ আছে, তারা চান একটা সামগ্রিক আন্দোলন গড়ে উঠুক | তাদের বক্তব্যের ভিডিও ক্লিপ লিঙ্কে পেয়ে যাবেন |

আমরা কী পেলাম ?

দুই দিনের হাঁটায় আমরা সব মিলিয়ে তিরিশ জন উপস্থিত ছিলাম | সমগ্র চূর্ণীর নদীর উৎস থেকে মোহনা হেঁটে আমরা মানুষের সমস্যাগুলিকে বোঝার চেষ্টা করেছি, কয়েক হাজার মানুষের সাথে আমরা জল সমস্যা নিয়ে কথা বলতে পেরেছি ; তার থেকে যেমন উঠে এসেছে অনেক নতুন নতুন তথ্য, বেশ কিছু আগ্রহী মানুষকে আমরা পেয়েছি যারা জল নিয়ে, চূর্ণী নদী নিয়ে ও তার আশেপাশের নদীনালা জলাভূমি নিয়ে কাজ করতে চায় | আগস্টের মাঝের দিকে চূর্ণী নদীর মোহনা থেকে উৎস পর্যন্ত মানুষদের নিয়ে একটি “জল সভা” গঠন করা হবে, “জল সভা” নিরবিচ্ছিন্নভাবে চূর্ণী অববাহিকায় “জল সম্পদ” নিয়ে কাজ করবে |

২য় দিনের পদযাত্রা ছিল বগুলা থেকে পাবাখালি | দূরত্বটা কম তাই দুপুরের মধ্যেই আমরা পৌঁছে যাই পাবাখালিতে ; যেখানে মাথাভাঙা থেকে চূর্নী ও ইছামতীর উৎপত্তি হয়েছে | মাথাভাঙা ও চূর্ণীর সঙ্গমে বিষাক্ত কালো জল | আর মাথাভাঙা ও ইছামতীর সঙ্গম স্থলে কোথাও ধান চাষ হচ্ছে, কোথাও সব্জি, একটু দূরেই ইছামতীর উপর দিয়েই স্থায়ী রাস্তা দিয়ে প্রতিদিন শয়ে শয়ে টোটো থেকে লরি চলছে | স্থানীয় মৎস্যজীবীরা জানালেন মাথাভাঙা থেকে অনেক বছরই বর্ষাকালেও জল যায় না ইছামতীতে | আমাদের সকলেরই মনটা খুব খারাপ, আমাদের সামনে নদীমাতৃক বাঙলার তিন প্রাচীন সমৃদ্ধ নদী মাথাভাঙা, ইছামতী আর চূর্ণী ; মাথাভাঙা আর চূর্ণী বিষে জর্জরিত হয়ে মানুষের কাছে অভিশাপে পরিনত হয়েছে, আর ইছামতীর তো উৎসটাই আজ টোটো লরি বয়ে চলা রাস্তায় পরিনত হয়েছে |

একটু দুরেই একটা ট্যাপ থেকে নিরবিচ্ছিন্ন জলের ধারা বয়ে চলেছে, শেষটা হয়ত চেন্নাইতে |

চূর্ণী নদী নিয়ে details জানুন ভিডিও থেকে

Advertisements