সম্পাদকের কলম : গঙ্গার জল পবিত্র কিনা তা বিশ্বাসী মানুষেরাই জানবেন ভালো, তবে গঙ্গা, যমুনার জলে যে অন্যরকম কিছু আছে যা কলেরার মতো ব্যাকটেরিয়াকে ধ্বংস করতে পারে তা কিন্তু ১৮৯৬ তেই Ernest Hanbury Hankin উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন | তারই পথ অনুসরণ করে আবিস্কৃত হল যে গঙ্গার মতো নদীগুলোতে ব্যাক্টেরিওফাজ নামে এক ধরনের ভাইরাস আছে যার আন্টিব্যাকটেরিয়াল কার্যকারিতা রয়েছে | তারপর থেকে ব্যাক্টেরিওফাজ নিয়ে নিরলস গবেষণা চলেছে | বর্তমানে আই. আই.টির মতো প্রতিষ্ঠানও গঙ্গার ব্যাক্টেরিওফাজ নিয়ে গবেষণায় আগ্রহ দেখিয়েছে, দূষণের সাথে ব্যাক্টেরিওফাজ কমার সম্পর্ক দেখানোর চেষ্টাও হয়েছে বিস্তর ; পত্রপত্রিকায় গবেষণা নিয়ে যে তথ্য পাওয়া গেছে, তা ভালো করে পর্যালোচনা করলে বোঝা যাবে গবেষণাগুলি অসম্পূর্ণ ও ভুলভাবে ব্যাখ্যা করা |

গঙ্গাজল পবিত্র নয় : ছবিতে click করে ভিডিও দেখুন

সাম্প্রতিক কালে ভারতের ইউনিয়ন ওয়াটার রিসোর্সেস মিনিস্ট্রি বলেছে যে গঙ্গার মতো ভারতীয় নদীগুলিতে ব্যাক্টেরিওফাজের পরিমাণ পাওয়া গেছে নজর কারার মতো, তবে গঙ্গার হিমালয় সংলগ্ন অংশে পরিমান অনেক বেশি | নাগপুরের NEERI গঙ্গা ও ভাগীরথীর কুড়িটি জায়গা থেকে জলের নমুনা নিয়ে পরীক্ষা করে দেখেন | এই নমুনা পরীক্ষা তারা গঙ্গা ছাড়াও যমুনা ও নর্মদা নদীতেও করেন | নদীগুলিতে তারা ব্যাকটেরিয়া ও ব্যাকটেরিয়া ধ্বংসকারী ব্যাক্টেরিওফাজের অনুপাত নির্ণয় করার চেষ্টা করেন | গঙ্গাতে ব্যাক্টেরিওফাজ ব্যাকটেরিয়া থেকে তিনগুণ বেশি পাওয়া যায় | ব্যাক্টেরিওফাজের প্রজাতির সংখ্যাও গঙ্গার হিমালয় সংলগ্ন অংশে বেশি, নর্মদার মতো নদীতে যেখানে ২০০ প্রজাতির ব্যাকটেরিওফাজ পাওয়া গেছে গঙ্গার হিমালয় সংলগ্ন অংশে পাওয়া গেছে ১১০০ প্রজাতির ব্যাকটেরিওফাজ | যত মোহনার কাছে যাওয়া গেছে ব্যাকটেরিওফাজের প্রজাতির সংখ্যা ও পরিমাণ কমে গেছে |

অনেকেই মোহনার দিকে ব্যাকটেরিওফাজের সংখ্যা কমে যাওয়ার জন্য গঙ্গার দূষণকে দায়ী করছেন | কিন্তু ব্যাকটেরিওফাজের বৈশিষ্ট্য নিয়ে বিস্তারিত জানলে গঙ্গার দূষণকে হয়তো ওতটা আর দায়ী করা যাবে না | সবচেয়ে বেশি সংখ্যক যে জীব পৃথিবীতে আছে তা হল ব্যাকটেরিওফাজ, যা সংখ্যায় ব্যাকটেরিয়া থেকেও দশগুণ | যেখানে ব্যাকটেরিয়া আছে সেখানে ব্যাকটিরিওফাজও আছে অর্থাৎ পৃথিবীর সবরকম পরিবেশেই ব্যাকটেরিওফাজ থাকতে পারে ; সাহারার উষ্ণ প্রস্রবণে যেমন থাকতে পারে তেমনি মেরুর বরফাবৃত হ্রদেও থাকতে পারে | ব্যাকটেরিওফাজ জলাভূমি, মাটি, খাবার, বর্জ্য, কাদামাটির ভিতর সর্বত্র পাওয়া যায় ; এমনকি মানুষ ও পশুদের শরীরের বিভিন্ন অংশেও থাকতে পারে | অর্থাৎ জল দূষিত হলে ব্যাকটেরিওফাজ কমে যাবে বিষয়টি তেমনও নয়, বরং উল্টোটাই বেশি সত্যি হতে পারে, জল যদি একশ শতাংশ পরিশুদ্ধ হয় জলে ব্যাকটেরিওফাজও থাকবে না কারন ব্যাকটেরিয়া থেকেই ব্যাকটেরিওফাজ জীবন ধারন করে, বংশবৃদ্ধি হয় |

অর্থাৎ গঙ্গার হিমালয় সংলগ্ন অংশে ব্যাকটেরিওফাজ বেশি ও মোহনার দিকে কমতে থাকে এর কারন গঙ্গার দূষণ না হওয়াই বেশি যুক্তিপূর্ণ হওয়ার কথা | ব্যাকটেরিওফাজ অসংখ্য প্রজাতির হয়, গঙ্গার হিমালয় অংশে ১১০০ রকমের চিহ্নিত করা গেছে | এক একটা প্রজাতি আবার এক এক রকমের পরিবেশে থাকতে পারে | জলের উষ্ণতা, অম্লতা, লবণের উপস্থিতির উপর নির্ভর করে প্রজাতির সংখ্যা বদলে যায় | গঙ্গার উচ্চ প্রবাহের কম উষ্ণতা, কম লবণ ও উপযুক্ত অম্লতার উপস্থিতির জন্য সবেচেয়ে বেশি প্রায় ১১০০ রকমের ব্যাক্টেরিওফাজ পাওয়া যায়, মোহনার দিকে উষ্ণতা ও লবণ বাড়ার সাথে সাথে ব্যাকটেরিয়াফাজের প্রজাতির সংখ্যাও কমে যায় | এই কমে যাওয়ার পিছনে গঙ্গা দূষণ যে দায়ী তার তেমন কোন প্রমান নেই, এমনকি অতীতের এমন কোন তথ্য ভান্ডারও নেই যেটা প্রমান করে যখন দূষণ কম ছিল তখন ব্যাকটেরিওফাজ বেশি ছিল, দূষণ বাড়ার সাথে ব্যাকটেরিওফাজও কমেছে |

ব্যাক্টেরিওফাজ

ব্যাক্টেরিওফাজের সামগ্রিকতা বিচার করলে বোঝা যাবে শুধু গঙ্গারই আন্টিব্যাকটেরিয়াল ক্ষমতা আছে এমন নয়, সব নদীরই আছে, উত্তরের হিমালয় সংলগ্ন অঞ্চলে উপযুক্ত পরিবেশের জন্য ব্যাকটেরিওফাজ বেশি, আন্টিব্যাকটেরিয়াল ক্ষমতাও বেশি | এই মুহূর্তে নদীগুলো নিয়ে আরো বেশি গবেষণা দরকার | তার সাথে প্রত্যেকটি নদীকেই নিজের মতো করে বইতে দেওয়া দরকার ; তবেই গঙ্গা যেমন গঙ্গাত্বকে অটুট রাখতে পারবে তেমন প্রত্যেকটি নদীই গঙ্গা হয়ে উঠবে |

Advertisements