শুভজিৎ করচৌধুরী : ১৪৫১ সাল। উষ্ণায়নের ঢাকে কাঠি পড়তে ঢের দেরি। পশ্চিম রাজস্থানে জম্বাজি বলে এক সন্ত জন্মগ্রহণ করেন । রাজস্থানে তখন মুসলিম আক্রমণকারীদের সঙ্গে হিন্দু যোদ্ধাদের নিত্যদিনের ঝগড়া চলছে। বয়সটা একটু বাড়তেই জম্বাজী খেয়াল করলেন যুদ্ধে বড়ো অমঙ্গল লেখা আছে। পারিবারিক যুদ্ধচর্চা ছেড়ে সাধনায় ডুবে গেলেন তিনি। ১৪৮৫ সালে ফের ফিরে এলেন পৃথিবীর কাছে। একটা নতুন জীবনচর্যা, নতুন ধর্মমত নিয়ে। ২৯ খানি বিশ্বাস, ২৯ খানি নির্দেশ তৈরি হল- বিশনোই সম্প্রদায়। বিশনোই নামটার মধ্যেই লুকিয়ে আছে ২৯-এর রহস্য। কারণ বিশ মানে কুড়ি, আর নোই মানে নয়।

এই ২৯ খানি নির্দেশের মধ্যে সম্পৃক্ত ছিল প্রকৃতি। খুব কাছ থেকে পরিবেশকে দেখেছিলেন গুরু মহারাজ জম্বাজী। রাজস্থানের রুক্ষ শুষ্ক অঞ্চলে গাছের মাহাত্ম্য বুঝেছিলেন হ্রদয় দিয়ে। পশুপাখিদের ভালোবেসেছিলেন প্রাণ থেকে। তাই প্রচার করতে পেরেছিলেন ”জীব দয়া পালনি”- জীবে দয়া। বলেছিলেন ”রুখ লীলা নাহি ঘাবে”- সবুজ গাছ কেটোনা কখনো।

মারওয়াড়ের ধূ ধূ বালির প্রান্তরের ওপর দিয়ে তারপর অনেক বাতাস বয়ে গেছে। প্রায় তিনশো বছর কেটে যাবার পর ১৭৩০ সালে খেজারলি গ্রামের বিশনোইরা আবার ইতিহাসের পাতায় উঠে এলেন। যোধপুরের মহারাজা অভয় সিংহ নতুন প্রাসাদ গড়বেন। প্রচুর কাঠ প্রয়োজন। খেজারলি গ্রামে প্রচুর খেজরি বা অ্যাকাসিয়া গাছের প্রাচুর্য। সবই লাগিয়েছেন বিশনোইরা। রাজার সৈন্যরা দল বেঁধে গাছ কাটতে আসে। বিশনোইরা নিজের সন্তান বিসর্জন দিতে রাজি, কিন্তু প্রকৃতির কোনো ক্ষতি তাঁরা হতে দেবেন না। তাই যথারীতি গর্জে উঠল বিশনোইরা। অমৃতা দেবী বলে এক বিশনোই গৃহবধূ জড়িয়ে ধরলেন প্রিয় খেজড়ি গাছগুলো। অমানুষিক সাহসে ভর করে বললেন – ”কাটা মাথা কাটা গাছের চেয়ে বরং বেশি সস্তা।” তাই মাথা কাটা গেলেও গাছ ছেড়ে নড়বেন না তাঁরা। রাজার সৈন্যদের মানে লাগল কথাগুলো। শাস্তি হিসেবে অমৃতা দেবীর মাথা কেটে নিল তাঁরা। মাকে শহীদ হতে দেখে মেয়ে এগিয়ে এল। তাঁরও কপালে একই শাস্তি লেখা ছিল। তারপর আরো ৩৬৩ জন বিশনোই। গাছকে জড়িয়ে ধরে ছিলেন মৃত্যু পর্যন্ত। এই অবিশ্বাস্য তান্ডবটা হয়ত আরো কিছুক্ষণ চলত, কিন্তু ইতিমধ্যেই খবর গেছে মহারাজের কাছে। খবর পেয়ে তিনি দৌড়ে এলেন। সমস্ত ঘটনা শুনে মর্মাহত হলেন রাজা এবং নির্দেশ দিলেন বিশনোইদের গ্রাম থেকে কোনো গাছ কাটা যাবে না। রাজা বিশনোইদের এলাকাকে সংরক্ষিত বলে ঘোষণা করেন। চিপকো আন্দোলনেরও বহু আগে এভাবেই মাটি কাঁপিয়ে দিয়েছিল অমৃতা দেবীদের আত্মহুতি।

আজো তাই মনপ্রাণ এক করে প্রকৃতির সেবা করে বিশনোইরা। বছরে চারমাস চাষের কাজ করেন তাঁরা। বাকিটা সময় আশায় আশায় বসে থাকেন ওই শস্যে হয়ত বছর কেটে যাবে। প্রায়ই হরিণ এসে ফাঁকা করে যায় শস্যের গোলা। তবু গুরু জম্বাজীর শিষ্যরা ক্ষুধার্ত পশুদের সেবা করেন অন্তর থেকে। এছাড়া অনেকে কাঠের কাজ করে দিন গুজরান করেন। অথচ কাঠের প্রয়োজনে জীবন্ত গাছের গায়ে কুড়ুল বসাতে তাঁদের আত্মায় বাঁধে। তাঁরা ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করেন, গাছ মারা যাবার পর কাঠ সংগ্রহ করা হয়। এমনকি রান্নার কাজে ঘুঁটে ব্যবহার করতেই স্বচ্ছন্দ বোধ করেন বিশনোই মা বউরা। কাঠের জ্বালে রান্না সারতে মায়া বোধ হয় প্রাণে।

বিষ্ণুর উপাসক হলেও মৃতদের কবর দেন বিশনোইরা। হেরিটেজ হোটেল, ইন্ডিয়ার ভাইস প্রেসিডেন্ট ও লুনি (বিশনোই) বিধানসভা কেন্দ্রের প্রাক্তন বিধায়ক মহারাজ স্বরূপ সিংহ ৩৬ বছর ধরে বিশনোইদের সঙ্গে কাটিয়েছেন। তিনি বলেন- “জম্বাজী জানতেন একটা সার্থক ধর্মমত গ্রহণ করার জন্য তাঁকে হিন্দু মুসলমান দুধরনের উপাদানকেই গ্রহণ করতে হবে। তাই একদিকে তিনি বিশনোইদের বিষ্ণুর উপাসনা করতে বলেন, অন্যদিকে মৃতদেহ কবরস্থ করার নির্দেশ দেন। এভাবে আসলে প্রকৃতির সম্পদ প্রকৃতির মধ্যেই ফিরিয়ে দেওয়া যায়। আমরা হিন্দুরা এজন্য আগুনের ব্যবহার করি, আর মুসলমানেরা মাটি ব্যবহার করেন।” কিন্তু যোধপুর অঞ্চলে সবথেকে বড় বিশনোই গ্রাম গুড়ার দেব রাম মনে করেন- “জম্বাজী মনে করতেন মৃতদেহ সৎকারের জন্য একটা বেঁচে থাকা গাছ কেটে ফেলাটা একদম বোকামি। মাটির কাছ থেকে আমরা যা পেয়েছি তা আমরা মাটিতেই ফিরিয়ে দিই।”

দৌড়ে পালিয়ে যাওয়া কৃষ্ণসার হরিণ বা পেখম তুলে নেচে বেড়ানো ময়ূর সর্বদাই দেখা যায় বিশনোইদের গ্রামে। জম্বাজী বলে গিয়েছিলেন মৃত্যুর পর কৃষ্ণসার হরিণের মধ্যে তাঁর আত্মা প্রতীয়মান হয়ে রয়ে যাবে। এই বিশ্বাস আজও রয়ে গেছে। তাই আজও হরিণ মারার খবর পেলে মূহুর্তের মধ্যে এককাট্টা হয়ে যেতে পারেন পাঁচশো বিশনোই। এক এয়ারফোর্সের অফিসার হরিণ মারার চেষ্টা করেছিলেন বিশনোই গ্রামের আশেপাশে। তাঁকে উলঙ্গ করে গরম বালির মধ্যে ফেলে রেখেছিলেন তাঁরা। প্রকৃতির ধ্বংস রুখতে এতটাই কঠোর হতে পারেন আপাত নিরীহ মানুষগুলি। ”আমাদের কাছে পশুরা ঈশ্বরের অবতার যে”- জবাব দেন জনৈক বিশনাই।

১৯৯৮ সালে বিশনোইদের গ্রাম কঙ্কিনীতে বলিউড অভিনেতা সলমান খান এই ইন্ডিয়ান অ্যান্টিলোপ বা কৃষ্ণসার মৃগ হত্যা করেছিলেন। বলিউড ভুললেও বিশনোইরা ভোলেননি। কুড়ি বছরের লড়াইয়ের পর ২০১৮ সালে সলমান খানের পাঁচ বছরের জেল হয়।

বিশনোইরা সবুজ মানুষ বলে হারতে জানেন না। ইকো ফ্রেন্ডলিনেস আত্মস্থ করেছেন ওঁরা। আমাদের পরিবেশ প্রেমের ফ্যাশন কি আরো কিছু শিখবে ওঁদের কাছ থেকে?

চিপকো আন্দোলন : ছবি প্রতীকী

তথ্যসূত্র: ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস, ইকোলজিস.ইন, গ্লোবাল ননভায়োলেন্ট অ্যাকশন ডেটাবেস

Advertisements