সম্পাদকের কলম : ন্যাশানাল অ্যাকাডেমি অফ সায়েন্স, স্ট্যানফোর্ড -এর গবেষণা অনুযায়ী বর্তমানে ভারতের অর্থনীতি বিশ্ব উষ্ণায়ণের জন্য ৩১% ছোট ; অর্থাৎ পরিবেশ আগের মতো থাকলে ভারতের অর্থনীতি বর্তমান থেকে ৩১% বড় হত, কর্মসংস্থান বাড়ত, বেকার সমস্যায় লাগাম পরানো যেত | ১৯৬১ থেকে ২০১০ পর্যন্ত বাতাসে গ্রিনহাউস গ্যাসের ঘনত্ব বাড়ার সাথে সাথে নরওয়ে ও সুইডেনের মতো ঠান্ডা দেশের অর্থনীতি আরো সমৃদ্ধ হয়েছে কিন্তু ভারত ও নাইজেরিয়ার মতো গরম দেশের অর্থনীতির উপর খারাপ প্রভাব পড়েছে |‌

বিশ্ব উষ্ণায়ণের ঘাড়ে সব দায় ঝেড়ে দিলেই কিন্তু চলছে না | পরিবেশের এই হাল কেন হল ? ভারতীয় যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন স্তরের প্রশাসকদের কি কোন দায় নেই ? দায় তো আছেই, দায়ের সবটুকুই কেন্দ্র ও রাজ্যসরকারগুলির উপর যুক্তিসম্মতভাবে চাপানোই যায় | ভারতের কার্বনডাইঅক্সাইড নির্গমন তুলনামূলকভাবে যথেষ্ট কম পৃথিবীর গড় নির্গমন থেকে ; পৃথিবীর জন প্রতি বছরে কার্বনডাইঅক্সাইড নির্গমন যেখানে ৪.২ টন সেখানে ভারতের ১.৮ টন | কিন্তু সমস্যা হল ভারতের ক্ষেত্রে নির্গমন লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে, ২০১৭ তে নির্গমন বেড়েছে ৪.৬% | তার উপর ১৩০ কোটির দেশ হওয়ায়র ফলে কার্বনডাইঅক্সাইড নির্গমনে ভারতবর্ষ চতুর্থ , আরও ভয়ের যেটি তাহল প্রথম চার দেশের মধ্যে একমাত্র ভারতের নির্গমনের গ্রাফ ঊর্ধ্বমুখী |

এই অবস্থা হওয়ার কারন, কেন্দ্র বা রাজ্য কেউই জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবহারে নিয়ন্ত্রণ আনার তেমন কোনও চেষ্টাই করেনি | ২০১৮ এর তথ্য অনুযায়ী ভারতের মোট বিদ্যুতের ৫৬.৮৯% কয়লা নির্ভর তাপবিদ্যুৎ, গ্যাস নির্ভর ৭.২১%, ডিজেল নির্ভর ০.২৪% যা বিপুল কার্বন নির্গমনের একটি কারন | শুধু তাই নয় বিদ্যুতের চাহিদাও ক্রমাগত বেড়ে চলেছে ভারতে | ২০১৭ এর তথ্য অনুযায়ী বছরে ১১৬০ বিলিয়ন ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদন করে ভারত এখন বিদ্যুৎ উৎপাদনে তৃতীয়, চীন ও আমেরিকার পর | ২০১০ থেকে ২০১৭ এই সাত বছরে বিদ্যুৎ উৎপাদন বেড়েছে ৩৪% | যদিও এই উৎপাদন চাহিদার তুলনায় অনেক কম | বিদ্যুতের এতটা চাহিদা বৃদ্ধির কারন খুঁজতে গেলে দেখা যাবে আমাদের জীবনযাত্রার মানের আমূল পরিবর্তন হয়ে গেছে এর মধ্যে | জন প্রতি সম্পদের পরিমাণ বেড়েছে এইসময়ে ফলে শক্তির চাহিদাও বেড়েছে তার সাথে পাল্লা দিয়ে | প্রযুক্তি যত উন্নতি হচ্ছে মানুষের প্রযুক্তির প্রতি নির্ভরশীলতা বাড়ছে যা বিদ্যুতের চাহিদা বাড়িয়ে তুলছে প্রতিদিন | সরকার বিষয়টির উপর একেবারেই গুরুত্ব দেয়নি, কোন উপযুক্ত নীতিমালা তৈরি করতে সক্ষমও হয়নি |

পরিবহন ক্ষেত্র এই মুহূর্তে সবচেয়ে বড় কার্বনডাইঅক্সাইড নির্গমক | ২০১৫ এর তথ্য অনুযায়ী ভারতবর্ষে প্রতিদিন নতুন মোটরচালিত গাড়ি সংযোজন হয় ৫৩,৭২০টি । ২০১০ থেকে মোটরচালিত গাড়ির ব্যবহার বেড়েছে লাফিয়ে লাফিয়ে, তথ্য বলছে ১৯৯৩ তে প্রতিদিন নতুন গাড়ি সংযোজন ছিল মাত্র ২,৭৪০ | মানুষ নিজস্ব গাড়ির দিকে এতটা ঝুঁকছে কেন ? বিশেষজ্ঞদের মত, এর কারন সরকারের জন-পরিবহন ক্ষেত্রের ব্যর্থ নীতি, কেন্দ্র কিংবা রাজ্য কোনও সরকারই জন-পরিবহনে সঠিক গুরুত্ব দেয়নি, ফলে মানুষের নিজস্ব গাড়ির প্রতি আগ্রহ বেড়েছে লাফিয়ে লাফিয়ে | এছাড়াও যেটি গুরুত্বপূর্ণ তা হল নিজস্ব গাড়ি ক্রয়ে কোনো নিয়ন্ত্রণও সরকার আনতে পারেনি, ব্যাঙ্কগুলোও গাড়ি ক্রয়ের জন্য মধ্যবিত্তের কাছে আলাদিন হয়ে উঠেছে | ফলে গাড়ি বাড়ছে তার সাথে কার্বন নির্গমনও | বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন আগামী ২০ বছরে মোটরচালিত গাড়ির সংখ্যা দাঁড়াবে ৩৫ কোটি, যা এখন ১৯ কোটি | ফলে বোঝাই যাচ্ছে কার্বন নির্গমন কী ভয়ঙ্করভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে আগামী দিনগুলিতে |

সমস্ত বিষয়গুলি তাও কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আনা যেত যদি প্রাকৃতিক পরিবেশকে ঠিকভাবে রক্ষা করা যেত, তাদের আরো সমৃদ্ধ করা যেত | কিন্তু সে বিষয়ে কোনও চেষ্টাই হয়নি | নতুন নতুন প্রজেক্টের নাম করে উন্নয়নের নাম করে বিগত দুই দশকে জঙ্গল, পাহাড়, নদী, খাল-বিল নষ্ট করে ফেলা হয়েছে | জঙ্গলের বাইরের গাছও রেহাই পায়নি অপরিকল্পিত উন্নয়নের গ্রাস থেকে | এর ফলে বাতাসে বাড়তে থাকা কার্বনডাইঅক্সাইডকে মাটিতে ফিরিয়ে আনার সহজ উপায়গুলো হারিয়ে গেছে অনেকটাই | জঙ্গল, পাহাড়, নদী, খালবিলের গাছ কার্বনডাইঅক্সাইডকে শোষণ করে গ্রিন হাউস গ্যাস কমিয়ে দিতে পারে | তথ্য বলছে একটা মাঝারি সাইজের গাছ বছরে প্রায় ৩০ কেজি কার্বনডাইঅক্সাইড শোষণ করতে পারে | অন্যদিকে গাছ সাদা মেঘ তৈরি করতে পারে, সাদা মেঘ সহজেই সূর্যের আলোকে প্রতিফলিত করে বাইরে বের করে দিতে পারে | সামগ্রিকভাবে বাড়তে থাকা কার্বনডাইঅক্সাইড নির্গমনের সাথে একটা সাম্যে আসা যেত যদি বড় গাছগুলোকে কাটা না হত |

এছাড়াও স্থানীয় পরিবেশকে ঠান্ডা করার বিশেষ ক্ষমতা গাছের আছে | বিশেষজ্ঞরা বলছেন বাষ্পায়ানের মাধ্যমে একটা গাছ দিনে কুড়ি ঘন্টা কাজ করা প্রমান সাইজের দশটা রুম ঠান্ডা করা এয়ার কন্ডিশনারের সমতুল্য কাজ করতে পারে | গাছের পাতা ৯০% সূর্যালোক শোষণ করতে পারে ফলে গাছের নীচে ঠান্ডা থাকে | গাছ আমাদের শারীরবৃত্তীয় তাপানুভূতি ৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস থেকে ১৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস কমিয়ে দিতে পারে | গাছ কমার সাথে সাথে পরিবেশ এই অসাধারন সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়েছে | বেশ কিছু সার্ভেতে দেখা গেছে মানুষের কাজ করার ক্ষমতা আরামদায়ক তাপমাত্রা থেকে বেশি তাপমাত্রায় কমতে থাকে যা বিশ্ব উষ্ণায়ণের জন্য ভারতের অর্থনীতিতে খারাপ প্রভাবের একটা সূত্র বলে অনেক বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন |

এর একটা বিপরীত মতামত যদিও আছে, এবং তা বেশ শক্তিশালীও কারন সরকার ও কিছু সংস্থা একে প্রচার করছে | সরকারি তথ্য বলছে ভারতে গ্রিণ কভার বেড়েছে তাকে আবার নাসার দেওয়া তথ্য সমর্থন করছে | বিষয়টি আদতে সে রকম নয় বলে মনে করছে রাজ্যের পরিবেশকর্মীরা | ভারতবর্ষে প্রতি মুহূর্তে ঘন জঙ্গল ও ঘন গাছের বেষ্টনী কমছে, তার সাথে কমছে বেশি বয়সের গাছও ; তার বদলে পাতলা গাছের স্তর বাড়ছে তাই গ্রিন কভার বাড়লেও গাছের সামগ্রিক ভর কিন্তু কমেছে ভয়ঙ্করভাবে, তার সাথে কার্বন শোষনের ক্ষমতাও | তাই এখন হয়ত আমাদের ভাবনা চিন্তার বেশ খানিকটা পরিবর্তন আনা দরকার ; সবসময় পরিবেশকে উন্নয়নের কুড়ুলে ধ্বংস করার প্রবণতার পরিবর্তন প্রয়োজন | উন্নয়ন করতে গেলে, কর্মসংস্থান বাড়াতে গেলে, বেকার সমস্যাকে গলা টিপে মারতে গেলে ; পাহাড়, নদী, জঙ্গল, জলাভূমিকে নষ্ট করতেই হবে – এই বস্তাপচা ধারণাকে স্টানফোর্ডের নতুন গবেষণাটি অন্তত অনেকটা বদলে দিল | তবে কেন্দ্রের ও রাজ্যের দাদা দিদিদের বোঝার ক্ষমতা হবে কিনা তা সময়ই বলবে |

Advertisements