দ্য গ্রিন ওয়াক ব্যুরো : রাজ্য জুড়েই বড় গাছের সংখ্যা প্রতিদিনই কমে যাচ্ছে উন্নয়নের ঠেলায়|টাকি রোড, জিটি রোড, চাকদহ রোড, কল্যানী রোড, দিল্লী রোড, কৃষ্ণনগর রোডের শতাব্দী প্রাচীন গাছ তো অনেক আগেই কাটা হয়ে গেছে | তারপরও এখন কিছু পুরানো গাছ রাস্তা, বিভিন্ন পার্ক ও সংরক্ষিত অঞ্চলে কোনরকমে টিকে আছে ; কিন্তু সেগুলির পরিচর্যা ও রক্ষণাবেক্ষণের কোন রকম প্রচেষ্টাই দেখা যাচ্ছে না |

গাছের রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে কলকাতার রবীন্দ্র সরবরোরের অবস্থা এখন যুদ্ধক্ষেত্রের মত | রবীন্দ্র সরোবরে প্রাতঃভ্রমণের সময় নিজেকে অক্ষত রাখতে গেলে মাথায় হেলমেট অবশ্যই পরতে হবে, না হলে পেল্লাই মড়া ডাল মাথায় পড়া স্বাভাবিক ঘটনা | কোন গাছ বিপজ্জনক ভাবে হেলে পড়ে আছে, কোন গাছ বহুবছর ধরে মৃত অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছে, কোন গাছ আবার ব্যাকটেরিয়াল ও ফাঙ্গাল ইনফেকশনে ভিতর থেকে ফোঁপরা হয়ে যাচ্ছে ; একটু বাতাস দিলেই যখন তখন বিপদ ঘটাতে পারে |‌

বারাসাতের হেলা বটতলা থেকে ব্যারাকপুর যাওয়ার রাস্তারও অবস্থা বিপজ্জনক | এই রাস্তায় শতাব্দী প্রাচীন মেহগনি গাছ রাস্তাটিকে যেন জড়াজড়ি করে আছে | অনেক ডালই শুকিয়ে বিপজ্জনকভাবে ঝুলছে, যখন তখন পড়ছেও গাড়ি ও পথচলতি মানুষের উপর | দেগঙ্গা থেকে বসিরহাট যাওয়ার রাস্তায়ও একই অবস্থা | রাজ্যে অন্যতম বৃক্ষবহুল রাস্তা যশোর রোডের অবস্থা সবচেয়ে করুণ | দুই শতাব্দী প্রাচীন চারহাজার ঐতিহ্যবাহী শিরীষগাছ রাস্তাটিকে সবুজ খুলিগুহার মতো রূপ দিয়েছে, রূপটা ভয়ঙ্কর হয়ে উঠেছে বিপজ্জনকভাবে দাঁড়িয়ে থাকা কিছু গাছ ও ডালপালা | গাছের ডাল পরে মৃত্যুর খবর পর্যন্ত পাওয়া গেছে, আহত হওয়ার ঘটনা তো প্রায়ই ঘটছে | বনগাঁর পরিবেশকর্মী সুমি সিকদার জানান,

” গাছগুলো রক্ষণাবেক্ষণের জন্য বনদপ্তর কিছুই করে না, গাছগুলো বহুদিনের পুরানো ফলে ফাঙ্গাল ও ব্যাকটেরিয়াল আক্রমণ গাছগুলিতে প্রায়ই ঘটছে, তারজন্য কোন ব্যবস্থাই কেউ নিচ্ছে না, এছাড়া বর্ষার আগে শুকনো ডালপালা ছেটে দেওয়া দরকার, সেটাও হচ্ছে না | তাছাড়া অবৈজ্ঞানিকভাবে গাছের ডাল কেটে দেওয়া হচ্ছে প্রায়ই, ফলে গাছ নিজের ওজনের ব্যালেন্স রাখতে পারছে না, একটু বাতাসে ভেঙে যাচ্ছে | এইভাবে সাধারন মানুষের গাছের প্রতি ক্ষোভ তৈরি হচ্ছে, আসল দোষ কিন্তু বনদপ্তর বা সংশ্লিষ্ট দপ্তরের |”

রবীন্দ্র সরবরোরের প্রাত:ভ্রমণকারীদের পক্ষ থেকে কে. এম.ডি.এ.-র চিফ এক্সিকিউটিভ ইঞ্জিনিয়ার ও লেক পরিচর্যার দায়িত্বে থাকা সুধীন নন্দীকে এই বিষয়ে অবহিত করা হয়। তাঁদের তরফ থেকে জানানো হয় ফরেস্ট ডিপার্টমেন্ট ও কে.এম.ডি.এ.- র যৌথ উদ্যোগে এই মৃত গাছগুলিকে সরানোর ব্যবস্থা করা হবে। ফরেস্ট ডিপার্টমেন্টের পক্ষ থেকে ইতিমধ্যেই মৃত গাছগুলিকে নম্বর দিয়ে দাগিয়ে দেওয়া হয়েছে। লেকের প্রাত:ভ্রমণকারী ও পরিবেশ প্রযুক্তিবিদ সোমেন্দ্র মোহন ঘোষ বলেছেন,

“কালবৈশাখীর আগেই এই শুকিয়ে যাওয়া মৃত গাছগুলির অপসারণ প্রয়োজন। ঝড়ের আগে না কাটলে লন্ডভন্ড হয়ে যেতে পারে জাতীয় সরোবরের অতি সুন্দর পরিবেশ। পরিবেশবিদরা এই বিষয়ে লেক কর্তৃপক্ষকে পূর্ণ সহযোগিতা করবেন। তবে যে গাছগুলি ব্যাক্টেরিয়া আক্রান্ত তাদের পরিচর্যার জন্য বৃক্ষ বিশেষজ্ঞদের সাহায্য প্রয়োজন এই মূহুর্তে।”

পরিবেশ-প্রেমী সুমিতা ব্যানার্জীও সোমেন্দ্র মোহন ঘোষের বক্তব্যকে পূর্ণ সমর্থন করেছেন।শুধু গাছ লাগানো নয়, গাছকে বড় করে তোলা তাকে পরিচর্যা করা, নিয়মিত তার ডালপালা ছাটা ও খুব জরুরি | পরিবেশকর্মী কল্লোল রায় বলেন,

“গাছকে গুরুত্ব দেওয়ার সময় এসেছে, আমরা শুধুমাত্র আর্থিক লাভের হিসাব করলেই গাছের থেকে মূল্যবান আর কিছু হতে পারে না | তাই সরকারকে অবশ্যই আরো বেশি করে ভাবনাচিন্তা করতে হবে বৃক্ষ সংরক্ষণের জন্য |”

গাছের নিচে দিয়ে যেতে যদি হেলমেট পরার মতো অবস্থা হয়, তার থেকে খারাপ অবস্থা হয়ত হতে পারে না | এখন দেখার পরিবেশবিদ, পরিবেশকর্মী ও সাধরন মানুষের আবেদন সরকারকে কতটা আন্দোলিত করে |

Advertisements