শুভজিৎ করচৌধুরী : আট মাস কেটে গেছে। নিজের মেরুদণ্ডে দুশো চল্লিশটার বেশি আবর্তনের পরেও তেমন কিছু পাল্টায়নি পৃথিবীতে। এখনো জীবাশ্ম জ্বালানীর ধোঁয়ার ওপরেই ভরসা মানুষের, যদিও বিশ্ব উষ্ণায়ন তার নির্ধারিত মাত্রা ১.৫ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড অতিক্রম করে গেছে। সমুদ্রগর্ভে চিপসের প্যাকেটের রাজত্ব, তিমিদের পেটে চলে যাচ্ছে খিদের ঝোঁকে। তবু গ্রেটা থুর্নবার্গ একটা আশার আলো। বিশ্ব ধরিত্রী দিবস ছিল সোমবার। গ্রেটা ছিলেন লন্ডনে। পরিবেশবাদী মানুষদের আইন অমান্য আন্দোলনে টালমাটাল রাজধানী শহর। এই প্রতিবাদের পোষাকি নাম দেওয়া হয়েছে এক্সটিংশন রেবেলিয়ন। সুইডেনের ষোলো বছরের ছাত্রী গ্রেটা এক্সটিংশন রেবেলিয়ানকে পূর্ণ সমর্থন করে বলেন,

“এমন একটা ভবিষ্যত, যেটা আমাদের কাছ থেকে কেড়ে নেওয়া হচ্ছে, সেই ভবিষ্যতের জন্য পড়াশোনা করেই বা কী লাভ হবে?”

গ্রেটা এরকমই। সাহসী, সরল, একমুখী আর সোজা। গ্রেটার যাত্রাটা শুরু হয়েছিল অন্যভাবে। গ্রেটা ছোট্টোবেলা থেকে অ্যাসপারাগাস্ আর সিলেকটিভ মিউটিজমের শিকার। এমন কোনো বিষয় যা ভাবায়, কষ্ট দেয়, আতঙ্কিত করে গ্রেটা মোটেই সেটা তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিতে পারেনা। আট বছর বয়স থেকে পরিবেশের সমস্যা গুলো এভাবেই গ্রেটার কাছে ধরা দিতে থাকে। ‘দ্য গার্ডিয়ান’কে দেওয়া একটা সাক্ষাৎকারে গ্রেটা বলেন –

“আমি খুব চিন্তা করি। আগে যখন ছোটো ছিলাম, আমাদের টিচাররা অনেক কিছু দেখাতেন, সমুদ্রে প্লাস্টিক, পোলার বিয়ারদের না খেতে পাওয়া। দেখতে দেখতে আমি কাঁদতাম। আমার বন্ধুরাও খুব মন দিয়ে দেখত। কিন্তু সিনেমা শেষ হলেই ওরা অন্য জিনিস চিন্তা করত। আমি সেটা পারতাম না।”

সিলেকটিভ মিউটিজম অবস্থার মানুষেরা অকারণে কথা বলতে পছন্দ করেন না। গ্রেটাও ব্যতিক্রম নন। বরং সেই ছোট্টোবেলা থেকেই পরিবেশের চিন্তা এতটাই নাড়িয়ে দেয় তাকে যে বহুদিন ইস্কুল যেতে পারেনি গ্রেটা।

বাড়িতে সঙ্গী বলতে বাবা আর মা। তাঁদের সঙ্গে গ্রেটার শুধু পরিবেশের কথা বলতে বলতেই দিন কেটে যেত। গ্রেটার বাবা সভান্তে থুর্নবার্গ লেখক আর অভিনেতা। মা ম্যালেনা এরনম্যান সুইডেনের প্রখ্যাত অপেরা গায়িকা। সাক্ষাৎকারে গ্রেটা বলেন –

“খুব মন খারাপ হয়ে গেল আর স্কুল যাওয়া ছেড়ে দিলাম। যখন বাড়িতে থাকতাম বাবা মা খুব যত্ন করত, আর আমরা খালি কথা বলতাম। কারণ কথা বলা ছাড়া আমাদের আর কিছু করার ছিল না। তখনই আমি জলবায়ু পরিবর্তন আর পরিবেশ নিয়ে আমার চিন্তাটা বাড়িতে বলেছিলাম। ওরা খালি বলত সব ঠিক হয়ে যাবে তাতে কিন্তু আমার মন খারাপ ঠিক হল না, কিন্তু কথা বলে একটু ভালো লাগত। সবসময় খালি এই নিয়েই কথা হত, আমি বাবা মাকে ছবি, গ্রাফ, ফিল্ম, রিপোর্ট, অার্টিকেল সব দেখাতাম। কিছুদিন পর থেকে ওরা আমার কথা আস্তে আস্তে বুঝতে শুরু করল। ওরা বুঝতে পারল আমি আসলে কী বলতে চাইছি। তখনই আমি বুঝতে পারলাম যে চাইলে আমিও কিছু পাল্টাতে পারি।”

এরপর থেকে কেরিয়ারের ক্ষতি স্বীকার করেও গ্রেটার মা প্লেনে যাতায়াত ছেড়ে দিলেন, বাবা ভেগান হয়ে গেলেন।
২০ শে অগাস্ট ২০১৮; শুক্রবার, বেলা আটটা। গ্রেটা থুর্নবার্গ সেদিন ইস্কুল না গিয়ে কয়েকটা পোষ্টার নিয়ে সুইডিশ পার্লামেন্টের সামনে বসে পড়ল। এটাই ‘স্কুল স্ট্রাইক ফর ক্লাইমেটের’ সূত্রপাত। তারপর থেকে প্রতি শুক্রবার ইস্কুল না গিয়ে রাস্তায় ধর্নায় বসার এই রীতি আস্তে আস্তে নাড়িয়ে দিচ্ছে পৃথিবীকে। ৭১ টা দেশের ৭০০ জায়গায় তরুণ প্রজন্ম বেছে নিয়েছে গ্রেটার রাস্তা।
ডাভোসের সম্মেলনে রাজনৈতিক নেতা আর বিলিয়নিয়ার ব্যবসায়ীদের ভিড়ে পিগটেইল বাঁধা গ্রেটা মুখের ওপর বলেন –

“আমি আপনাদের ভালো কিছু আশা করতে বলছিনা আপনারা ভয় পান। আমি চাই আপনারা সেই ভয়টা পান যেটা আমি প্রত্যেকদিন পাচ্ছি। এবং তারপর আপনারা কি করবেন ঠিক করুন।”

রাজনীতির মানুষরা গ্রেটাকে বাহবা দিলেও একটা জিনিস জানেননা গ্রেটা –

“ওরা এখনও কিছু করছে না। আর এটাও আমি বুঝতে পারছিনা যে সত্যিই ওরা কেন আমাদের সমর্থন করছে! আসল্ তো আমরা ওদের সমালোচনাই করছি।”

গ্রেটা কি খানিকটা আশায় আছেন? অবস্থার কি কোনো উন্নতি হয়েছে?

“না, যখন শুরু করেছিলাম তার থেকে একটুও বেশি আশান্বিত নই। এমিশন একটুও কমেনি।”

এই সারল্যটাই গ্রেটা।

“আমি মানুষের সাথে ভালো মিশতে পারিনা। যদি পারতাম তাহলে হয়তো একটা সংগঠন বানাতাম। বরং আমি নিজে নিজেই যা কিছু করেছি।”

গ্রেটার সাদা কালো মনস্তত্ত্বে আন্দোলনটা চালিয়ে নিয়ে যাওয়া ছাড়া আর কোনো বিকল্প নেই। গ্রেটা তাই করবেন। যতদিন না পর্যন্ত সুইডিশ পার্লামেন্ট প্যারিস চুক্তির সঙ্গে সাযুজ্য রেখে পরিবেশ নীতির বদল না ঘটাবে ততদিন গ্রেটা স্ট্রাইকটা জারী রাখবেন। জেনারেল স্ট্রাইকের প্রতিও পূর্ণ সমর্থন আছে তার। কারণ অস্তিত্বের সংকটে ভুগছে তার প্রিয় পৃথিবী; সোমবার বিশ্ব ধরিত্রী দিবসে লন্ডন থেকে এই বার্তাই দিলেন গ্রেটা থুর্নবার্গ।
তথ্যসূত্র : দ্য গার্ডিয়ান

Advertisements