শুভজিৎ করচৌধুরী : যাদব মোলাই পায়েঙের নামটা ইন্টারনেটের দৌলতে অনেকেই জানেন। কিন্তু তাঁর কথা বারবার বলতে খারাপ লাগে না। স্রেফ একা হাতে মস্ত একটা জঙ্গল বানিয়ে ফেলেছেন তিনি। আজো তাঁর জঙ্গলে ১১০টা থেকে ১১৫টা হাতি ঢুঁ মেরে যায় প্রতি বছর। জঙ্গলের মতো যাদব পায়েঙের কথাও পুরোনো হয় না কখনো।

আসামের জোড়হাট শহরটা নতুন কিছু না। সেই পরতে পরতে জড়ানো ধুলো, ধোঁয়া, গাড়িঘোড়ার হইচই আর নোংরা ড্রেনের গল্প। জোড়হাট শহরের উত্তর দিক দিয়ে বয়ে যায় ব্রহ্মপুত্র। তার বুকে জেগে ওঠা পৃথিবীর সবথেকে বড় নদীমাতৃক চরটির নাম হল মাজুলি। গাছগাছালি ছাওয়া এই চরটায় প্রতি বছর একেকবার করে বন্যা হয়। দ্বীপবাসীরা ঠাঁইনাড়া অবস্থায় কয়েকদিন ঘুরে বেড়ান জলের ওপরে। অন্যদিকে ব্রহ্মপুত্রের ক্ষয়কাজের জন্য প্রতি বছর একটু একটু করে ক্ষয়ে যায় মাজুলি। গত ৫০-৬০ বছরে এইটাই মাজুলি দ্বীপের গল্প। এই মাজুলিরই বাসিন্দা হলেন যাদব পায়েঙ।

শুরু হয়েছিল ১৯৭৯ সালে। তখন যাদব বছর ষোলোর স্বপ্ন মাখা কিশোর মানুষ। আসামের গোলঘাট জেলার সোস্যাল ফরেস্ট্রি ডিপার্টমেন্টের উদ্যোগে ব্রহ্মপুত্রের মাজুলির ওপর অরুণা চাপুরি গ্রামে ২০০ হেক্টর জায়গাকে কেন্দ্র করে গাছপোঁতা শুরু হয়েছে। অন্য মজুরদের সাথে কাজে লাগলেন যাদবও। এইসময় যাদব খেয়াল করলেন ব্রহ্মপুত্রের ওপর একটা স্যান্ডবার জেগে আছে, অরুণা চাপুরি থেকে দেড় কিমি দূরে। গোটা স্যান্ডবারে এক চিলতে সবুজ নেই কোথাও। এবছর বন্যার জল অনেকগুলো সাপকে এনে ফেলেছিল ধূসর স্যান্ডবারের ওপর। অস্বাভাবিক গরমে কুড়িখানা সাপ মারা যায়। যাদবের হয়তো খারাপ লাগে। যাদব আর বাকি মজুরদের সঙ্গে ফিরতে চাননি। ওখানেই রয়ে গেলেন নিজের হাতে একটা জঙ্গল তৈরী করবেন বলে, আর সেটাই হল শুরু।

এরপর থেকে কখনো বীজ ছড়িয়ে, কখনো চারা পুঁতে ৫৫০ হেক্টর জায়গা জুড়ে যাদব মোলাই পায়েঙ গড়ে তুললেন সেই মস্ত জঙ্গল। এখন সেখানে বাঘ, হাতি, গন্ডার, বাঁদর, পাখিদের রামরাজ্য তৈরি হয়ে গেছে। যাদব নজর রাখেন প্রতিদিন, কারণ তিনি জানেন চোরাশিকারীরাও নজর রাখছে তাঁর তৈরী করা জঙ্গলের ওপর। সরল গলায় যাদব জানান, “মানুষই তো একমাত্র প্রাণী যে প্যান্ট শার্টও পড়ে, সাপ ব্যাঙ সব খায়। তাই সবথেকে বেশি ভয় মানুষদেরই।”

যাদব পরিবার নিয়ে এখনও মাজুলিতেই থাকেন। জীবিকার প্রয়োজন মেটান দুধ বিক্রি করে। তাঁর একশটার বেশি গবাদি পশু এখন অবধি বাঘের পেটে গেছে। তবু যাদব খুশি। লোকমুখে তাঁর জঙ্গলটা ‘মোলাই ফরেস্ট’ নামে পরিচিত হয়ে গেছে। প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি এ.পি.জে. আবদুল কালাম তাঁকে উপাধি দিয়েছেন ‘ফরেস্ট ম্যান অফ ইন্ডিয়া’। ২০১৫ সালে পেয়েছেন পদ্মশ্রী।

যাদব কিন্তু মনে মনে স্বপ্ন দেখেন জীবনের শেষদিন পর্যন্ত তিনি গাছ লাগিয়ে চলেছেন। এভাবে হয়ত গোটা মাজুলি, গোটা জোড়হাট শহরটাকেই তিনি সবুজে মুড়ে দেবেন একদিন।

যাদব মোলাই পায়েঙ
Advertisements