দ্য গ্রিন ওয়াক ব্যুরো : কলকাতা থেকে ৭২ কিমি উত্তর-পূর্ব দিকে, বনগাঁ শহর থেকে ১৩ কিমি দক্ষিণে পাঁচপোতা গ্রামে বেড়ি-গোপালপুর বাওর রাজ্যের মধ্যে আয়তনের দিক থেকে বৃহত্তম অশ্বক্ষুরাকৃতি হ্রদ | একসময় এটি ইছামতী নদীর মূলপ্রবাহ ছিল, তারপরে একসময় ইছামতী নতুন খাত দিয়ে বইতে শুরু করলে পুরানো খাতটি অশ্বক্ষুরাকৃতি হ্রদের আকার নেয়, স্থানীয়রা যাকে বেড়ি বাওর বলে থাকেন | রাজ্যের সবচেয়ে বড় অশ্বক্ষুরাকৃতি হ্রদ, কিন্তু তাকে রক্ষা করার জন্য কোনো উৎসাহ নেই যেমন প্রশাসনের তেমনি স্থানীয়দেরও ; তাই দখলদারিদের কবলে পড়ে একটু একটু করে হারিয়ে যাচ্ছে অমূল্য সম্পদটি |

বেড়ি-গোপালপুর বাওর

জুওলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়ার রিপোর্ট অনুসারে হ্রদের আয়তন মোটামুটি ৪ বর্গকিমি ( Zoological Survey of India ; Occasional Paper no 195 ) | দ্য গ্রিন ওয়াক সার্ভে টিমের ২০১৯ এর সার্ভে রিপোর্ট অনুসারে বর্তমানে বেড়ি-গোপালপুর বাওরের ১.২৪ বর্গকিমি দখল হয়ে গেছে, সেখানে বাড়ি থেকে মন্দিরের বিভিন্নরকম নির্মাণ দেখা গেছে ; বেশিরভাগটা কৃষিজমি ও ভেড়িতে পরিণত হয়েছে । হ্রদের ভিতরেই ২১৭ টি ছোট বড় ভেড়ি খনন করা হয়েছে | হ্রদের প্রস্থ অর্থাৎ এক পাড় থেকে অন্য পাড়ের দূরত্ব ১৭৫ মিটার থেকে ৩৫০ মিটার পর্যন্ত, যদিও অনেক স্থানেই অবৈধ নির্মাণ ও ভেড়ির জন্য দূরত্ব ১৫০ মিটারের কাছাকাছি হয়ে গেছে | গভীরতা ৫ মিটার থেকে ৯ মিটার পর্যন্ত | হ্রদের স্বাস্থ্য ফেরানো ও বন্যা নিয়ন্ত্রণের জন্য একমাত্র কাজ যা সরকার করেছে তাহলে ইছামতীর সঙ্গে খাল কেটে বাওরের সাথে সংযুক্তকরণ ঘটানো হয়েছে |

হ্রদ দখল হচ্ছে এই ভাবে

বেড়ি-গোপালপুর বাওর মাছ ও পাখির জন্য একসময় বিখ্যাত ছিল | ৬১ রকম মাছ ও ৬৪ রকমের পাখি জুওলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়া চিহ্নিত করলেও বর্তমানে অর্ধেকের কম মাছ ও পাখি দেখতে পাওয়া যায় বলে স্থানীয়দের মত | বেড়ি-গোপালপুরের চারিদিকে সাত আটটি গ্রামের মাছের সংস্থান একসময় এই হ্রদটিই করত, বাওরটিকে কেন্দ্র করে একটি মৎস্যজীবী সমিতি কাজ করে, অনেক জেলে সম্প্রদায়ই এর উপর নির্ভরশীল ছিল | এক দশক আগেও যা মাছ পাওয়া যেত তার ৩০ শতাংশ এখন পাওয়া যায় কিনা বলে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন স্থানীয়রা | বর্তমানে মাছের মধ্যে কয়রা, চিতল, ফলুই, সিলভার কাপ, বাঁশপাতা, কাতলা, মৃগেল, আমেরিকান রুই, ঘেসো রুই, বাটা, কালবসু, রুই, চাঁদা, পুঁটি , ট্যাংরা, পাবদা, মাগুর, শিঙি, শোল, ল্যাটা, তেলাপিয়া, খলসে, পাকাল মাছ দেখা যায় | পাখির মধ্যে এখনো ডুবুরি, পানকৌড়ি, অঞ্জন, বড় বক, গো বক, লাল বক, কালো বক, ধূসর বক, শামুকখোল, সরাল, বড় সরাল, নানা রকম হাঁস, ডাহুক, জল মোরগ, জল কুক্কুট, চখা-চখি, কাস্তেচড়া, বেগুনিকালেম, কাদাখোঁচা পাখি দেখা যায়, তবে সংখ্যা অনেকটাই কম | স্থানীয়দের দাবি অনেক অসচেতন মানুষই পাখি শিকার করে বাজারে নিয়ে আসেন তা বিক্রি করতে, তাই পাখির সংখ্যা কমে গেছে |

হ্রদের পাশেই বাড়ি আইনের মাস্টার্স সুস্মিতা বিশ্বাস জানান,

সুস্মিতা বিশ্বাস

“ছোটবেলায় বাওরে কত জল ছিল, অনেক অনেক মাছ পাওয়া যেত, সমিতির ঘাটে মাছ ধরার সময় প্রায় এক মাস ধরে বাজার বসত কিন্তু এখন কিচ্ছু নেই..আগে স্নান করেও শান্তি পাওয়া যেত, এখন এতই নোংরা থাকে যে বহুবছর জলেই নামি না ; এখন বাওড়ের ধারে গেলে কেমন কষ্ট হয় |”

হ্রদটি আছে বলে এলাকার ভৌমজলের স্তর এখনও খুব বেশি নিচে নামেনি, আর্সেনিকের প্রভাবও অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় তুলনামূলকভাবে কম | বেড়ি-গোপালপুর হ্রদটি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করে যাচ্ছেন পাঁচপোতার তরুণ শিক্ষক ও পরিবেশকর্মী জ্যোতিপ্রিয় ঘোষ । তিনি বাওর নিয়ে যেমন স্থানীয়দের মধ্যে সচেতনতা প্রসারের চেষ্টা করে চলেছেন তেমনি প্রশাসন থেকে পত্র-পত্রিকা দপ্তরে চিঠিপত্র দিয়েই চলেছেন | শ্রী ঘোষ জানান,

জ্যোতি প্রকাশ ঘোষ

“বেড়ি-পাঁচপোতা এলাকার বাসিন্দাদের দীর্ঘদিনের দাবি, ফিরিয়ে দেওয়া হোক বেড়ি-পাঁচপোতার পুরোনো ঐতিহ্য । ভারতবর্ষের ভ্রমন মানচিত্রে স্থান পাক বেড়ি-পাঁচপোতা । ইকোপার্কের ধাঁচে সাজিয়ে তোলা হোক পাঁচপোতার বেড়ির বাওরকে । এছাড়াও আশেপাশের বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী এলাকা তেঁতুলবেড়িয়া, গড়জেলা, কালাঞ্চী, ঝাউডাঙ্গা, বলদেঘাটা ইত্যাদি এলাকা নিয়ে সুন্দরবন বা দার্জিলিং এর মতো গড়ে তোলা হোক ইকোট্যুরিজম । কলকাতার কাছেই হ্রদে ঘেরা এত সুন্দর প্রাকৃতিক পরিবেশ ভ্রমণপ্রিয় মানুষের কাছে এক অন্য মাত্রা নিয়ে যাবে, একথা নিঃসন্দেহে বলা যেতে পারে। হয়ত আগামী দিনে ওড়িশার চিল্কা বা কাশ্মীরের ডাললেকের মতো দেশি-বিদেশি পর্যটকের অন্যতম গন্তব্য হবে বেড়ি-পাঁচপোতা ।”

দেরিতে হলেও স্থানীয়রা বেড়ি-গোপালপুর হ্রদটির গুরুত্ব ধীরে ধীরে বুঝতে পারছেন | স্থানীয় প্রশাসনকেও এক্ষেত্রে এগিয়ে আসা দরকার । কেননা শুধুমাত্র সচেতনতাই যথেষ্ট নয় হ্রদ বাঁচানোর জন্য, দখলদারিতা রুখতে প্রশাসনকে কঠোর ব্যবস্থাও নিতে হবে | এখন দেখার স্থানীয় মানুষ ও প্রশাসন দাঁত থাকতে দাঁতের মর্ম বোঝেন কিনা |

বেড়িগোপালপুর হ্রদ
Advertisements