দ্য গ্রিন ওয়াক ব্যুরো : রাম নেই, তাই অযোধ্যাও বেহাল। সোনাঝুরির রমরম করে চলা হোটেলের দাপটে ঘুম উড়ে যাচ্ছে পাখিদের। গত পনেরো কুড়ি বছর ধরে একটু একটু করে এরকমই একটা ট্রাজেডির গল্প লিখছে শান্তিনিকেতন। অনেকের মতো গ্রিন ওয়াকের বন্ধু মেঘনা রায় দেখে এলেন কতটা অস্বাস্থ্যকর অবস্থায় ভুগছে খোয়াই, কোপাই, সোনাঝুরির বকুল বিছানো বীথি। তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী,

“পনেরো বছর আগেও এমন অবস্থা ছিল না। এখন খোয়াইয়ের কাছে যে অন্য হাট হয়, বড় রাস্তা থেকে শুরু করে তিন ভাগে সেই হাটটা বসে। তাতে শুধু শান্তিনিকেতন নয়, ফুলিয়া, কলকাতা থেকেও বিক্রেতারা আসেন। হাটের সমস্ত ময়লা, প্লাস্টিক সব কিছুতে নোংরা হয়ে যায় পুরোটা। এছাড়া সোনাঝুরির বনের মধ্যে প্রচুর হোটেল, রাতে তাদের ফ্লাড লাইটে জঙ্গলের পরিবেশের ক্ষতি হচ্ছে। হোটেলের ময়লা জল জঙ্গলের মধ্যে পড়ছে। প্রচুর গাছ কাটা হচ্ছে। এত মানুষ এখন এখান দিয়ে চলাচল করেন যে নতুন গাছও জন্মাতে পারেনা।”

এই প্রসঙ্গে শান্তিনিকেতনের পরিবেশ নিয়ে কাজ করা সংগঠন “ক্ষণিকা”র সঙ্গে গ্রিন ওয়াকের কথা হয়। তাঁদের কথায়,

“সোনাঝুরির কিছুটা জায়গা বিশ্বভারতীর, বাকিটা ফরেস্ট ডিপার্টমেন্টের। এখানে যে বড় ঝিলটা আছে আগে সেখানে পদ্ম ফুটত। কিন্তু বিগত কিছু বছর ধরে এখানে ধোপারা কাপড় কাচতে আসে। তারাই প্রায় শ’দুয়েক পাটাতন তৈরি করে রেখেছে ঝিলের ধারে। ময়লা, সাবানের ফেনা সব মিশছে ঝিলের জলে। আগের মতো আর পদ্ম ফোটে না। তার সাথে বোলপুর শহরেও খুব দূষণ হচ্ছে। ভিজিটরদের জন্য যে দোকানগুলো বসে, তাদের আবর্জনাগুলো রাস্তাতেই পড়ে থাকে।”

বিশ্ব ভারতীর ছাত্র জাহেদও ঝিলের দুরবস্থার কথা জানাল গ্রিন ওয়াককে |

শান্তিনিকেতনের প্রাক্তন ছাত্রী, প্রখ্যাত গায়িকা সাহানা বাজপাঈ বর্তমানে লন্ডনে থাকেন। ছোটোবেলা থেকেই শান্তিনিকেতনের আকাশ, বাতাসের মধ্যে বড় হয়েছেন। লন্ডন থেকে তিনি টেলিফোনে জানালেন শান্তিনিকেতনের পরিবেশ বিপ্লবী শ্যামলী খাস্তগীরের প্রসঙ্গে –

“শ্যামলীদি একবার নিয়ম করলেন বসন্ত উৎসবে পলাশের গয়না পড়ে আর অনুষ্ঠান করা হবে না। ছোটো ছিলাম বলে কষ্ট হয়েছিল। কিন্তু একটু বড় হতে বয়ঃসন্ধিতে এসে বুঝলাম আসলে পলাশ তো বসন্তের প্রতীক, তাই গাছ থেকে ফুল পেড়ে গাছ ন্যাড়া করে বসন্ত উৎসব পালনের কোনো মানে হয় না।”

এইরকমই ছিল শান্তিনিকতনের পরিবেশ চেতনা।

কিছুদিন আগে থেকেই একটা খবর সোসাল মিডিয়াতে ঘোরাফেরা করছে যে সোনাঝুরির তিনশ গাছ কেটে হোটেল বানানো হবে। সেই প্রসঙ্গে তিনি বলেন,

“যখন ইস্কুলে পড়ি তখন থেকেই দেখছি এভাবে ওখানে গাছ কাটা, রিসর্ট তৈরি করা চলছে। নতুন কিছু নয়। আর এখানে লন্ডনে দেখি গোটা দেশটাই পরিবেশ সম্পর্কে কতটা সচেতন। একজন মাতালকে দেখেছিলাম, সে ওরকম অসুস্থ অবস্থাতেও নিজের বিয়ারের ক্যানটা ফেলার জন্য ডাস্টবিন খুঁজছে। যতদিন না ছোটো থেকে বাচ্চাদের পরিবেশের প্রতি সচেতন করে তোলা যাবে ততদিন এটা সম্ভব নয়। এখানে একটা ব্যাপার আছে – মেক আ ট্রি ইওর বেস্ট ফ্রেন্ড। বাচ্চারা গাছকে বন্ধু মনে করে। এখানে মাঠেঘাটে ফুটে থাকা ড্যাফোডিল ছিঁড়লেও ফাইন হয়। আমরা যেখানে থাকি তার কাছেই একটা পাহাড় মতো আছে। সেখানে একটা গাছ মরে যাবার পর একটা মেমোরিয়াল প্লেক লাগিয়ে দেওয়া হয়েছে। সেখানে লেখা আছে -আই হ্যাভ উইটনেসড্ ওয়াটারলু, আই হ্যাভ উইটনেসড্ ফার্স্ট ওয়ার্ল্ড ওয়ার ইত্যাদি। এই সচেতনতাটা কিন্তু বহু বছরের চেষ্টার ফসল।”

শান্তিনিকেতনের কোন গাছেরা কবিগুরুকে দেখেছিল তা কিন্তু কোথাও লেখা নেই। “ক্ষণিকা”র তরফ থেকে দ্য গ্রিন ওয়াককে সঙ্গে নিয়ে এই বর্ষায় বৃক্ষরোপণের উদ্যোগ নেবার একটা ছোট্টো অঙ্কুর সবে মাত্র দেখা দিয়েছে। শান্তিনিকেতনের মানুষরা সঙ্গে থাকবেন তো?

শান্তিনিকেতন
Advertisements