দ্য গ্রিন ওয়াক ব্যুরো : পিপ্পল বাবার আসল নাম পিপ্পল বাবা নয়। অশ্বত্থ গাছকে হিন্দিতে পিপ্পল বলে। সারা জীবন অশ্বত্থের চারা খুঁজে বেড়ান বলে লোকেরা তাঁকে নাম দিয়েছে পিপ্পল বাবা। আসল নাম স্বামী প্রেম পরিবর্তন। বিগত চল্লিশ বছর ধরে একটা মন ভালো করা কাজ করে আসছেন তিনি ।

পিপ্পল বাবা রাস্তাঘাটে কোথাও অশ্বত্থের চারা দেখতে পেলেই কুড়িয়ে নেন । তারপর নিয়ে আসেন সযত্নে গড়ে তোলা নিজের মস্ত নার্সারিটিতে। এখানেই খুঁটিনাটি পরিচর্যা চলে। তারপর সাবালক হয়ে গেলে ফাঁকা জায়গা দেখে লাগিয়ে দেন তাদের। এমন ভাবেই গত চল্লিশ বছরে এক কোটি কুড়ি লক্ষ অশ্বত্থের চারা বড় করে তুলেছেন স্বামীজী।

কিন্তু এত গাছ থাকতে অশ্বত্থ কেন? “আসলে ছোটোবেলায় মিলিটারি ক্যান্টনমেন্টে বড় হয়েছি। বাবা আর্মির ডাক্তার ছিলেন। পুণেতে থাকতাম তখন। এইসময় পুণেতে আমাদের মিলিটারি স্কুলে মিসেস উইলিয়ামস্ বলে একজন শিক্ষিকা ভূগোল পড়াতেন। ছোটোবেলা থেকে একটু একটু করে তিনি পরিবেশের প্রতি একটা অদ্ভুত সচেতনতা খুব যত্ন করে আমাদের মধ্যে ভরে দিয়েছিলেন। আর বাড়িতে ছিলেন ঠাকুমা। কোনো কারনে মন খারাপ হলেই তিনি আমাকে গাছের তলায় গিয়ে বসতে বলতেন। ব্যস সবকিছু মিলিয়ে গাছ লাগানোর একটা খেয়াল হয়ে গেল। এইসময় মানে ছয় থেকে এগারো বছরের মধ্যে দেখেছিলাম উন্নয়নের নামে কত গাছ কেটে দেওয়া হচ্ছে। গ্রামের দিকে আমি যে সময়ের কথা বলছি তখন এই অশ্বত্থতলা, বটতলাগুলো ড্রয়িং রুমের মতো ছিল। এদের কেটে দেবার ফলে গোটা গ্রামের সামাজিক জীবনটাই বিপর্যস্ত হয়ে পড়ত। তখন তো আর এখনকার মতো এত টিভি, ইন্টারনেট আর স্মার্ট ফোন ছিল না।”

প্রথম কবে গাছ লাগিয়ে ছিলেন? “প্রথম লাগিয়েছিলাম ১৯৭৭ সালের ২৬ শে জানুয়ারি। মোট ন’টা গাছ লাগিয়েছিলাম সেদিন। তার মধ্যে দুটো অশ্বত্থ গাছ। সেই শুরু।” তারপর থেকে গোটা দেশে এক কোটির ওপর অশ্বত্থের চারা ছাড়াও নিম গাছ লাগিয়েছেন চল্লিশ লক্ষ, আর লাগিয়েছেন আম, জাম, কাঁঠালের মতো অনেক গাছ। সব মিলিয়ে সংখ্যাটা দু কোটি ছুঁই ছুঁই। তবু মন ভরেনি তাঁর। বরং বলতে চান, খানিকটা অর্থ, খানিকটা লোকবলের অভাবেই আর বেশি গাছ লাগানো হয়ে ওঠেনি।

১৯৮৪ সাল থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত স্বামী প্রেম পরিবর্তন কাটিয়েছেন ধর্মগুরু ভগবান শ্রী ওশোর সঙ্গে। এখন দিল্লীর ময়ূরবিহারে ওশো পরিয়াবরন পাঠশালা নামে একটা ছোট্ট প্রকৃতি পাঠের স্কুল চালান পরিবর্তন। ওশো কি ভাবতেন পরিবেশ নিয়ে? “ওশো আমার দেখা শ্রেষ্ঠ পরিবেশবিদ। যখনই কোথাও ওশোর আশ্রম কিম্বা কমিউন হবার উদ্যোগ নেওয়া হত ওশো কিন্তু সাফ বলে দিতেন একটা পাথর, একটা গাছও নিজের জায়গা থেকে না সরিয়ে যা করবার করো। আমার বাড়ি থেকে ডাক্তারি পড়বার জন্য একটা চাপ ছিল, যেহেতু বাবা ডাক্তার। ওশো বুঝিয়েছিলেন ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার তো অনেকেই হতে পারে। কিন্তু আমাদের পৃথিবীর বোধহয় এমন একদল মানুষ চাই যারা পূর্ণ সময়ের ট্রি প্ল্যান্টার হবে। আমি ইংরেজি সাহিত্যের ছাত্র। ওশোই আমার পড়াশোনার ব্যবস্থা করেন। টাকা রোজগারের চিন্তা ছিল। ওশো বলেন তুমি শিক্ষক হও না কেন!”
আজো নিজের জীবনধারনের জন্য প্রাইভেট টিউশানির ওপরেই ভরসা করেন পিপ্পল বাবা। বাকি সময়টা এখনও তিনি পরিপূর্ণ সময়ের পরিবেশকর্মীই রয়ে গেছেন। তৈরি করেছেন “গিভ মি ট্রিস ট্রাস্ট” নামে একটি এন.জি.ও.। সারা ভারতে হাজার হাজার ভলিন্টিয়ারদের মাধ্যমে গাছ লাগিয়ে চলেছেন স্বামী প্রেম পরিবর্তন। আজও আশঙ্কা প্রকাশ করছেন ভারতবর্ষের মরে যাওয়া নদীদের নিয়ে। চিন্তান্বিত স্বরে বলছেন দিল্লি শহরের ভৌমজলতলের গভীরতা ক্রমশ বাড়ছে। আরো গাছ না লাগালে আগামী কয়েক বছরের মধ্যেই শুকিয়ে যাবে দিল্লির জল। মরুভূমি গ্রাস করবে প্রিয় শহরকে।

অশ্বত্থ গাছকে নিয়ে আমাদের দেশের অজস্র স্মৃতি। বুদ্ধদেব অশ্বত্থ গাছের তলাতেই বোধিলাভ করেছিলেন। পুরাণে আছে এই গাছের তলাতেই বিষ্ণুর জন্ম। স্বামী বিবেকানন্দ হিমালয়ের পথে কাকড়ি ঘাটের কাছে একটি অশ্বত্থের তলাতেই উপলব্ধি করেন বিশ্বব্রহ্মাণ্ড আর ক্ষুদ্রতম অণু পরমাণু আসলে একই নিয়মে বাঁধা। এই অশ্বত্থ গাছকে নিয়েই মেতে আছেন পিপ্পল বাবা। আজও সকাল সকাল দিল্লির কোনো রাজপথে হয়তো তাঁকে অশ্বত্থের চারা কুড়োতে দেখা যাবে। সামনেই বর্ষা আসছে যে!

স্বামী প্রেম পরিবর্তন
Advertisements