দ্য গ্রিন ওয়াক ব্যুরো : ২০১৭ ছিল রাজ্যের ইতিহাসে পরিবেশ আন্দোলনের এক নির্ণায়ক বছর আর তা অবশ্যই যশোর রোডের গাছ আন্দোলনকে কেন্দ্র করে | উন্নয়নের কোপে পড়া যশোর রোডের দুই শতাব্দী প্রাচীন চার হাজার ঐতিহ্যবাহী গাছ বাঁচাতে পথে নেমেছিলেন পশ্চিমবাংলার সর্বস্তরের মানুষ | যশোর রোডের গাছ বাঁচাও কমিটি ও এ.পি.ডি.আর. আন্দোলনের নেতৃত্বে থাকলেও আসল নেতৃত্ব ছিল পরিবেশের প্রতি অনুভূতিশীল সাধারন মানুষের হাতে | আর তার ভিতর থেকেই অন্য ধারার অন্যমাত্রার পরিবেশ আন্দোলন ‘দ্য গ্রিন ওয়াক’ শুরু হয়েছিল যা প্রতিদিন আরো প্রবল হচ্ছে | যশোর রোডের গাছের মামলায় গাছ বাঁচাও কমিটি ও এ.পি.ডি.আর. কলকাতা হাইকোর্টে হেরে যাওয়ার পর সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হওয়া হয়েছে | এখনও সুপ্রিম কোর্টের দিকে চেয়ে আছে যশোর রোডের মহীরুহরা | দুই বছর পর ২০১৯ এ TGW news যশোর রোডের গাছের ছায়ায় আর একবার হেঁটে এল, কেমন আছ যশোর রোড !

২০১৭ এর ফেব্রুয়ারি মার্চে বনগাঁ এক নম্বর রেলগেট সংলগ্ন যশোর রোডে গাছ কাটা শুরু হয়েছিল, কয়েকটা গাছ কাটার পরই হাইকোর্ট থেকে গাছ কাটার স্থগিতাদেশ আসে, আজ সেখানে গিয়ে দেখা গেল কাটা গাছের গুঁড়ির কিছু পড়ে আসে, সবটা নেই ; প্রশ্ন উঠছে বাকি গুঁড়িগুলো কোথায় গেল ? একটা গাছের উপরটা কাটা হয়েছিল গোড়া কাটা হয়নি, গাছটি নতুন ডালপালা গজিয়ে সবুজ হয়ে গেছে |

কাটা গাছে নতুন ডালপালা

রেলগেট সংলগ্ন অঞ্চলটিতে বেশ কয়েকটা দোকান ছিল, দুপুরের প্রচন্ড দাবদাহে দোকানগুলির বেশিরভাগই বন্ধ দেখা গেল | দুই বছর আগেও সেখানে একটা চায়ের দোকান ছিল, খবর নিয়ে জানা গেল চায়ের দোকানটি বন্ধ হয়ে গেছে | দোকানদারের খোঁজ নিয়ে তার সাথে দেখা হল, তিনি নিজের নাম বলতে চাননি কিন্তু কষ্টে গুমরে উঠলেন ,

“আমিও তখন গাছ কাটার পক্ষে ছিলাম, কিন্তু তখন বুঝতে পারিনি এত বড় বিপদ হবে ; গাছগুলো যখন ছিল দোকানে এত ঠান্ডা ছিল যে সবসময় মানুষ আমার দোকানে বসে থাকত, বিক্রিও হত সবসময়, গাছ কাটার পরে প্রচন্ড গরমে সবাই আমার দোকান এড়িয়ে চলতে লাগল, একটু দূরে যেখানে ছায়া আছে সেখানে সবাই যেতে লাগল, আমার বাঁধা খদ্দেররা আসা বন্ধ করে দিল | শেষে দোকানটাই বন্ধ করে দিলাম ; বিক্রি না হলেও দোকান রেখে কী করব !”

বনগাঁর এক নম্বর রেলগেট এখন মরুভূমি

এক নম্বর রেল গেট থেকে দুশো মিটার বারাসাতের দিকেই গেলে পুরানো সেই গাছের গুহারাস্তার দেখা মিলল, দুপুরেও প্রত্যেকে দোকানে খরিদ্দার গমগম করছে | কালুপুর পাঁচপোতার কাছে এক চায়ের দোকানে বড় একটা জমাটি আড্ডা দেখে আমাদের TGW news টিম থেমে গেল | আড্ডার মধ্যে থেকে বছর চল্লিশের সুদীপ মন্ডল জানালেন,

“আমার বাড়ি বনগাঁতেই, চাকদহ রোডে | আগে ওখানেও এরকম অনেক গাছ ছিল, গরম কালে এক্কেবারে এসি ; কিন্তু সব কেটে দিল | এখন সময় পেলেই এখানে চলে আসি, ঘরে ফ্যান চালালেও এত ঠান্ডা হয় না |”

যশোর রোডে বনগাঁ থেকে গাইঘাটা পর্যন্ত গাছ সব থেকে ঘন, দুপুরেও সমস্ত অঞ্চলে রাস্তার দুইপাশে দোকানগুলোতে যেন মেলা বসেছে ; গাছের ঘনত্ব মাঝে মাঝে কমে যায়, আর তার সাথে দোকানগুলিতে মানুষও |

গাছকে কেন্দ্র করে দোকান যশোর রোডে

চাঁদপাড়াতে জনৈক মুদিখানার দোকানদার জানালেন,

“গাছগুলো বেঁচে আছে বলে বড় বড় ঝড় থেকে আমাদের ঘরবাড়ি দোকান রক্ষা পাচ্ছে, ঝড়ঝাপটা যা কিছু সব ওদের উপর দিয়েই যায় |”

সমস্ত যশোর রোডে যেন পরিবর্তনের বাতাস, একবছর আগেও পাহাড় থেকে সাগর পদযাত্রায় গাছের কথা বলতে গিয়ে পদযাত্রীদের অনেক কু-কথা শুনতে হয়েছিল স্থানীয়দের কাছ থেকে, বছর ঘুরতেই তারা ভুলটা বুঝতে পেরেছেন | গাইঘাটার মাছ ব্যবসায়ী নারান দাস জানালেন,

“শুনেছি যশোর রোড নাকি হেরিটেজ হবে ? হেরিটেজ হলে গাছগুলো বাঁচত, না হলে প্রায়ই দেখি একটা করে গাছ কেটে ফেলা হচ্ছে ডালপালা ছাটার নাম করে |”

TGW news টিম সমস্ত রাস্তা জুড়ে তার প্রমানও দেখল, প্রায় প্রতিটি গাছের ডাল অবৈজ্ঞানিকভাবে কেটে ফেলা হয়েছে, এর ফলে গাছ তার নিজস্ব সাম্য হারিয়ে ফেলার অবস্থায় পৌঁছে গেছে, এত বড় বড় গাছ যদি নিজস্ব সাম্য হারিয়ে ফেলে তবে কখনও গাছগুলি মাটিতে দাঁড়িয়ে থাকতে পারবে না | আর পারছেও না, স্থানীয়দের বক্তব্য, একটু জোরে হাওয়া দিলেই গাছের গোড়া আলগা হয়ে যাচ্ছে আর গাছ কাটার সুযোগ পাওয়া যাচ্ছে | এই ভাবে একটা করে গাছ হারিয়ে যাচ্ছে |

যশোর রোডে যানবাহন তেমন নেই

রাস্তার বেশিরভাগ অংশেই গাড়ি চলাচলের সংখ্যা অতিরিক্ত চোখে পড়ে নি ; বনগাঁ শহরের মধ্যে ভিড়টা তুলনামূলকভাবে বেশি, আর সেটা রাস্তা চওড়া হলে বা রেলগেটের মুখে উড়ালপুল হলে কমবে বলে মনে হয় না | সবচেয়ে ভালো বিকল্প হতে পারে, শহরের ভিতরের দিকের রাস্তাগুলোকে আরো ভালোভাবে ব্যবহার করা, প্রাইভেট গাড়ির উপর নিয়ন্ত্রণ আনা, ট্রেন লাইনকে আরো ভালোভাবে ব্যবহার করা | নাম বলতে অনিচ্ছুক এক শিক্ষক জানান,

“গাছগুলো কাটা হলে এই অঞ্চলের মানুষের আর্থিক অবস্থার চরম অবনতি হবে, অন্তত রাস্তার পাশের দোকানদারদের বিক্রি অনেকটাই কমবে |”

বনগাঁর পরিবেশকর্মী সুমি সিকদার জানান,

“আমরা যশোর রোডকে গ্রিন হেরিটেজ করার দাবি রাখছি | গ্রিন হেরিটেজ করে দেশের একমাত্র স্থলবন্দর পেট্রোপলকে নিয়ে যৌথভাবে অসাধারন ইকো ট্যুরিজম গড়ে উঠতে পারে | তাহলে একদিকে যেমন দুই শতাব্দী প্রাচীন গাছগুলো ভবিষ্যত প্রজন্মের জন্য বেঁচে থাকবে তেমনি এই অঞ্চলের আর্থসামাজিক অবস্থার পরিবর্তন হবে , বেকার সমস্যার একটা পরিবেশবান্ধব সমাধান হবে |”

পুরানো ঘা বুকে নিয়ে যশোর রোড আবার স্বপ্ন দেখছে নতুন পৃথিবীর | গাছগুলো এইবার আর একা নয়, আশেপাশের মানুষও তাদের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে | আশা করি সরকারও গাছগুলোর পাশে দাঁড়াবে | রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জীর মত মরমি সবুজ প্রাণ মুখ্যমন্ত্রী গাছগুলোর পাশে দাঁড়াবেন নিশ্চিত | বাংলা প্রতিদিনই জগৎসভায় শ্রেষ্ঠ আসন অর্জন করছে, কন্যাশ্রী, সবুজসাথী তার প্রমান – আর একটা পালক বাংলার মুকুটে শোভা পেল বলে – যশোর রোড গ্রিন হেরিটেজ হওয়ার মধ্য দিয়ে | সকল সবুজপ্রেমী আশাবাদী |

যশোর রোডের গাছ
Advertisements