সম্পাদকের কলম : আজ গঙ্গাপুত্র ব্রহ্মচারী আত্মবোধানন্দজীর অনশনের ১৭৫ তম দিন | ২৭ বছরের তরুণ আত্মবোধানন্দ হরিদ্বারের মাতৃসদন আশ্রমে অনশনে বসেছেন অবিরল ও নির্মল গঙ্গার দাবি নিয়ে | যদিও তার দাবির প্রতি সরকারপক্ষ বা বিরোধীপক্ষ একফোঁটাও আগ্রহী নয় ; ১৩০ কোটি ভারতবাসী দাবিটিকে ভিত্তিহীন মনে করছে বলেই হয়ত দাবিটি নিয়ে জোরালো আওয়াজও উঠছে না | কিন্তু অন্তত পশ্চিমবাংলার ভিত প্রতিমুহূর্তে আলগা করে দিচ্ছে সমস্যাটি যার জন্য গঙ্গাপুত্রের অনশনে বসা |

ব্রহ্মচারী আত্মবোধানন্দ

ফারাক্কা থেকে সাগরদ্বীপ পর্যন্ত গঙ্গাবক্ষ প্রতিদিন শুকিয়ে যাচ্ছে একটু একটু করে | ফারাক্কা ব্রিজের দুই দিকে বড় বড় বালির চড়া পড়ছে | বালির চড়াতে মরুভূমির বালিতে যেসব গাছ দেখা যায় তাও দেখা দিচ্ছে | ২০১৮ তে পাহাড় থেকে সাগর একহাজার কিমি পদযাত্রায় পদযাত্রীরা ফারাক্কার চড়াগুলিতে নৌকা করে যেতে পেরেছিলেন | পদযাত্রীদের মধ্যে ছিলেন ছোট্ট বছর ছয়েকের শামিয়া , শামিয়া বালির চরে নেমেই তার বাবা মেহবুব আলমকে বলেছিলেন ,

আব্বা আব্বা ; এখানে উট নেই কেন ?

ছোট্ট শিশুর উপলব্ধি আর হরিদ্বারের আত্মবোধানন্দের উপলব্ধি হয়ত একই |

মুর্শিদাবাদের ধূলিয়ানের কাছে হুগলীর মূলপ্রবাহে জল নেই

শুধু ফারাক্কা নয় , সমস্ত ভাগীরথী-হুগলী বক্ষেরই একই অবস্থা ; বিগত ছয়মাসে নবদ্বীপ, ত্রিবেণী , দক্ষিণেশ্বরের ঘাটে মাঝগঙ্গা পর্যন্ত বালির চড়া দেখা দিয়েছে | এর কারন ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেছেন নদী বিশেষজ্ঞ সুপ্রতিম কর্মকার,

এই মুহূর্তে গঙ্গার জল ভাগ হচ্ছে বাংলাদেশের সঙ্গে কারণ জল বন্টন চুক্তি। আর সেই জন্যই জলের অভাব হচ্ছে ফারাক্কায়। জল বন্টন চুক্তির আগে ধারণা করা হয়েছিল গঙ্গাতে শুখা মরশুমে ফারাক্কাতে ৮০ হাজার কিউসেক জল আসবে। সেই ভেবেই বাংলাদেশকে ৪০,০০০ কিউসেক জল দেওয়ার কথা ভাবা হয় আর বাকি ৪০,০০০ কিউসেক জল থেকে ভাগ নিয়ে তা দেওয়া হবে কলকাতা বন্দরকে। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেল ফারাক্কাতে শুখা মরসুমে ৮০ হাজার কিউসেক জল আসছে না। আর এই সমস্যা দিন দিন যত যাচ্ছে ততই বাড়ছে। কাজেই বাংলাদেশকে জল দিয়ে ভাগীরথীর বুকে জলের পরিমাণ কমে যাচ্ছে। আর তাতেই গঙ্গার বুকে চড়া দেখা দিচ্ছে |

এখন প্রশ্ন হল, ফারাক্কাতে ৮০ হাজার কিউসেক জল কেন আসছে না শুখা মরসুমে ! পরিবেশকর্মী কল্লোল রায় যিনি গঙ্গার জন্য ভারতবর্ষের এক বিস্তীর্ণ অঞ্চল পদযাত্রা করছেন , তার দাবি,

ফারাক্কা জল না পাওয়ার কারন উত্তরের রাজ্যগুলির অপরিকল্পিত জলের ব্যবহার | রাজ্যগুলি প্রায় হাজারের উপর কৃষি বাঁধ ও খাল কেটে প্রতিদিন জল তুলে নিচ্ছে যথেচ্ছ ভাবে, তাছাড়া শহর-গ্রামগুলির প্রয়োজনের সব রকম জল পাইপলাইন দিয়ে ছড়িয়ে পড়ছে | এছাড়া গঙ্গা বক্ষে অবৈধ খনন , দুইপাশের গাছ কাটা তো আছেই | সব মিলিয়ে গঙ্গার ৯০% জলই ফারাক্কার আগেই নিঃশেষিত হয়ে যাচ্ছে |

পশ্চিমবঙ্গের আরেক নদী বিশেষজ্ঞ ও সবুজ মঞ্চের রাজ্য নদী কমিটির কনভেনর অনুপ হালদারের মতে ,

শুধু যে অন্য রাজ্য জল তুলে নিচ্ছে এমন নয় , পশ্চিমবঙ্গও একই কাজ করছে | স্থানীয় নদী, খাল বিলগুলোকে বিভিন্নভাবে ভরাট হয়ে গেছে , প্রতিদিন যাচ্ছেও ; মানুষ স্থানীয় নদী খাল বিলকে গুরুত্ব না দিয়ে গঙ্গা থেকে প্রতিদিন লক্ষ লক্ষ গ্যালন জল তুলে নিচ্ছে | ভাগীরথী-হুগলী মানুষের চাহিদার সাথে পেরে উঠছে না ফলে ভারতের এক নম্বর জলপথের মরুভূমায়ন হচ্ছে |

ভারত-বাংলাদেশ যৌথ নদী আন্দোলনের নেতৃত্ব তুহিন শুভ্র মন্ডলও একই মত পোষণ করেছেন |

ভাগরথী-হুগলী বক্ষে চড়া

ভাগীরথী-হুগলী বক্ষে যখন এই অবস্থা তখনই আবার বঙ্গোপসাগর সংলগ্ন একের পর এক দ্বীপ ক্ষয়প্রাপ্ত হতে হতে সাগরে মিলিয়ে যাচ্ছে | ইতিমধ্যেই নিউ মুর বা পূবার্শা দ্বীপ , লোহাচরা দ্বীপ , খাসিমারা দ্বীপ ডুবে গেছে | ঘোড়ামার দ্বীপের আর মাত্র ৩.৮৩ বর্গকিমি (দ্য গ্রিন ওয়াক সার্ভ টিম) অবশিষ্ট আছে | যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্ভে বলছে প্রায় দশটারও বেশি দ্বীপ এইভাবে ক্ষয়প্রাপ্ত হচ্ছে | একটি সূত্র বলছে ২০৫০ এর মধ্যে পশ্চিমবঙ্গের ১৭% ভূ-ভাগ জলের নীচে থাকবে | এর কারন যেমন বিশেষজ্ঞরা বিশ্ব উষ্ণায়ণকে ধরছেন তেমনি গঙ্গার নিম্নপ্রবাহে পলিহীনতাকেও ধরা হয়েছে | উত্তর ভারতে ৯০% জল চলে যাওয়ার সাথে সাথে পলিও চলে যাচ্ছে, যেটুকু পলি অবশিষ্ট থাকে তাও জলের স্বল্পতার জন্য অবিরলতার হানিজনিত কারনে সাগরের কাছে পৌঁছাতে পারে না | ফলে দ্বীপগুলির শুধুই স্বাভাবিক ক্ষয় হচ্ছে, পলি দিয়ে তার পূর্তি হচ্ছে না | এই পলির পরিমান কত হতে পারে ? রাজ্যের দূষণ নিয়ন্ত্রন পর্ষদের সভাপতি কল্যান রুদ্র কিছুটা ধারনা দিয়েছেন তাঁর বক্তব্যে ,

ফারাক্কাতে এই মুহূর্তে যা পলি আছে তাকে যদি লরি ভরে তুলে এনে গাঙ্গেয় ব-দ্বীপে ফেলতে হয় , যতগুলি লরি লাগবে তাকে পরপর সাজিয়ে দিলে পৃথিবীর নিরক্ষরেখাকে ১২৫ বার আবর্তন করতে পারবে |

ঘোড়ামারা এই ভাবে ডুবে যাচ্ছে

গঙ্গার অবিরলতা নষ্ট হওয়ার জন্য একদিকে দক্ষিণবঙ্গের উত্তরাংশের যেমন মরুপ্রাপ্তি ঘটছে , ভাগীরথী-হুগলী শুকিয়ে কাঠ হচ্ছে তেমনি দক্ষিণাংশে ক্রমশ ক্ষয়প্রাপ্তি ঘটে সাগর উত্তরমুখী হচ্ছে | ব্রহ্মচারী আত্মবোধানন্দের অনশনের যৌক্তিকতা ঠিক এখান থেকেই শুরু হয় | সব রাজনৈতিক দল বিষয়টিকে গুরুত্ব না দিলেও, ১৩০ কোটি ভারতবাসীর বেশিরভাগই না দেখার ভান করলেও বাঙলার পরিবেশপ্রেমী সাধারন মানুষ কিন্তু তাদের মতো করে পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছেন | রাজ্যে প্রতিনিয়ত প্রতীকী অনশন করছে বিভিন্ন পরিবেশবাদী সংগঠনগুলো, হরিদ্বারেও তারা পৌঁছে যাচ্ছে নিয়মিত | রাজ্যের বিশিষ্ট পরিবেশ নেতৃত্ব ও সাংবাদিক সঞ্জিৎ কাষ্ঠ জানান,

একসময় স্বামী বিবেকান্দের মত সন্ন্যাসীরা দেশের জন্য জীবনপণ করেছেন, ব্রহ্মচারী আত্মবোধানন্দও সেই ধারার ব্যতিক্রম নন | সন্ন্যাসীরা যুগ যুগ ধরে পরিবেশবান্ধব সমাজ সংস্কৃতির কথা বলেছেন, এই মুহূর্তে মাতৃসদন আশ্রমের এই আন্দোলন যথেষ্ট ইঙ্গিতবাহী |

আত্মবোধানন্দের সমর্থনে অনশনে নদীয়ার শিশুরা

আত্মবোধানন্দের আন্দোলনে অনুপ্রাণিত শিক্ষিকা রূপালী চাকলাদার বলেন,

পুরাণে বর্ণিত ভগীরথ কঠিন তপস্যার মধ্য দিয়ে স্বর্গের গঙ্গা কে মর্ত্যে আনয়ন করে সমাজের কলুষতাকে ধুয়ে পুনরুজ্জীবিত করেন। বর্তমানে সেই কলুষনাশিনী গঙ্গাকে অন্যায় ভাবে বেঁধে এবং আবর্জনায় চাপা দিয়ে সভ্যতাকে ধ্বংসের মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে স্বার্থান্বেষী কিছু মানুষ । তরুণ আত্মবোধানন্দ গঙ্গার অবিরল প্রবাহ ফিরিয়ে আনার জন্য যে আত্মত্যাগের সংকল্পে ব্রতী হয়েছেন যা বিশ্বের কাছে বিশেষ করে যুব সমাজের কাছে এক দৃষ্টান্ত। সভ্যতার জন্য, পরিবেশের জন্য, মানুষের কল্যাণের জন্য নিজেকে এভাবে বিলীন করে দেওয়ার যে বীজ বপন করে চলেছেন তা একদিন সবুজ করে তুলবে এই শতাব্দীকে।

বাংলার মায়েরা আত্মবোধানন্দের ত্যাগের ভালোবাসায় তাকে নিজের সন্তান করে ফেলেছেন, বিশিষ্ট নাট্যব্যক্তিত্ব নীলিমা বিশ্বাসের বুক ফেটে কান্না বেরিয়ে আসে,

মাঝে মাঝে বোধে হানা দেয়… আত্মবোধানন্দ… যখন ছেলের প্রিয় খাবারগুলো কড়াইতে নাড়াচাড়া করি… ওর মুখে তুলে দিই… মাত্র ছাব্বিশের উপোষি মুখটা চোখের সামনে ভেসে ওঠে…সাথে ওর মায়েরও… খাচ্ছি,দাচ্ছি,ঘুমোচ্ছি…কী নির্লজ্জতা! কী নির্লজ্জ আমার দেশ!

বাংলার তরুণদের মধ্যেও গঙ্গাপুত্র ও তার আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ছে | হরিদ্বারের তরুণ পরিবেশকর্মীর পাশে দাঁড়িয়েছেন হাওড়ার তরুণ পরিবেশকর্মী শুভ্রদীপ ঘোষও | দামোদর নিয়ে তিনি কাজ করতেন এতোদিন ; আজ তার বুকেও আত্মবোধানন্দ জেগে উঠেছে,

আত্মবোধানন্দের এই ত্যাগকে আমরা বৃথা হতে দেব না |

ব্রহ্মচারী আত্মবোধানন্দের ১৭৫ দিন অনশনের পরও ভারতবর্ষের বুকে এক ফোঁটা জল জমা হল কিনা তা বলার সময় এখনও আসেনি, হয়ত এই বলিদান যথেষ্ট নয়, যদিও আত্মবোধানন্দদেরও কোনো শেষ নেই ; মুখগুলো বদলাবে কিন্তু আত্মবোধানন্দের বোধের সত্ত্বারা চলতেই থাকবে উটের দেশে , যতক্ষণ না বালির বুক বিদীর্ন করে আরেকটা গঙ্গা বয়ে চলবে, ভারতের সব নদী গঙ্গা হয়ে উঠবে |

প্রতীকী ছবি
Advertisements