শুভজিৎ করচৌধুরী : আজ আপনাদের একটা প্রতিজ্ঞার গল্প শোনাই। একটা মস্ত টলটলে জলাশয়ের বদলে যাবার কাহিনি।

বঙ্গোপসাগরের তটভূমি যেখানে ভেঙেচুরে হঠাৎ উড়িষ্যার পেটের কাছে টুক করে আরো খানিকটা বেঁকে গিয়ে ফের এসে সমুদ্রের সঙ্গে মেশে সেখানেই গোরুর ক্ষুরের মতো একটা হ্রদ আছে যার নাম চিল্কা। অনেককাল আগে বঙ্গোপসাগরের মুখে পলি জমে চিল্কা সাগর থেকে আলাদা হয়ে যায়। তারপর ভিতরদিকে স্টেট অফ ওড়িশার বুক চিরে ধেয়ে আসা অসংখ্য নদী উপনদীর মিষ্টি জল আর অন্যদিকে বঙ্গোপসাগর থেকে বয়ে আসা নোনা জলের সংমিশ্রণে চিল্কার এই অদ্ভুত ইকোসিস্টেমের জন্ম। খানিকটা মিষ্টি জল আর খানিকটা নোনা জল হওয়ায় চিল্কার বুকে দু’ধরনের বাস্তুতন্ত্রের জীবরাই আশ্রয় পেয়ে থাকে। এই চিল্কার উত্তর পশ্চিমে অবস্থিত একটি অনিন্দ্য সুন্দর জলাভূমি হল মঙ্গলাজোড়ি। আমাদের দেশে প্রতিবছর সুদূর সাইবেরিয়া থেকে বেড়াতে আসা পাখিদের স্বর্গরাজ্য।

অথচ বছর বিশেক আগেও ব্যাপারখানা অন্যরকম ছিল। শান্ত একটেরে গ্রামগুলোতে দিন শুরু হত সন্ধ্যের পর থেকে। শিকারীরা সাজ সরঞ্জাম নিয়ে ছোটো ছোটো পানসিতে কুয়াশায় হারিয়ে যেত। পরদিন ভোরে তারা ফিরে আসত রাস্তা ধারের হাটে পাখির মাংস বিক্রি করতে। মঙ্গলাজোড়ির নল খাগড়ার বনে ঘাসের ডগা বেয়ে পাখির রক্ত সাতসকালে জলের কোলে চুপচাপ মিশে যেত।

মঙ্গলাজোড়ি থেকে পাঁচ কিলোমিটার পিছনে একটা ছোট্টো গ্রাম টাঙ্গি। সেই গ্রামের মানুষ নন্দকিশোর ভুজবল। ১৯৭০এর দশকে চাকরি করতে চলে গেছিলেন শহরে। ফিরে এলেন ১৯৯০ এর দশকে। এসে দেখলেন জলাভূমিতে তান্ডব করে বেড়াচ্ছে চোরাশিকারিরা। কোনোদিন গ্রে হেরণের পালা, তো কোনোদিন অত্যন্ত দুর্লভ ডানা ভাঙা ব্রাহ্মণী শেলডাকের। এইসব পাখিরা অনেকেই সুদূর রাশিয়া বা সেন্ট্রাল এশিয়া থেকে এদেশে এসেছিল। তারপর এক মায়ায় জড়িয়ে এই বাস্তুতন্ত্রের বুকেই বাসা বেঁধে নিয়েছে।

উঠে পড়ে লাগলেন নন্দকিশোর ভুজবল। আটকাতেই হবে পাখি মারা। চোরাশিকারিদের সর্দার মধু বেহেরা সহ আশে পাশের গ্রামের আরো বারোজন মানুষ মূলত এই ব্যবসাটা চালাতেন। শুরু হল প্রায় হাতে পায়ে ধরে সবাইকে বোঝানো। ফল মিলল না। উল্টে একদিন মধু বেহেরা তাঁর দশাশই ছুরিখানা নিয়ে নিজে হাজির ভুজবলের বাড়ি। নন্দকিশোর কিন্তু ঘাবড়ালেন না। তিনি চলে যেতে চান, কিন্তু পাখিরা বেঁচে থাকুক। বোধহয় বোধোদয় হল মধু বেহেরার। সর্দারের মন পাল্টানোতে সাঙ্গোপাঙ্গোরাও খানিকটা সচেতন হয়ে উঠলেন। তবু প্রশ্ন থেকে গেল, পেটের জ্বালা বড় জ্বালা। পাখি না মেরেও যদি দুটো টাকা বেশি রোজগার করা যেত তাহলে তারা সেটাই করতেন।

নন্দকিশোর ভুজবল এত চ্যালেঞ্জের মুখেও একটা উত্তর খুঁজে পেলেন। চোরাশিকারিদের মতো পাখি চেনেন খুব কম মানুষই। মানুষ যদি মঙ্গলাজোড়িতে ঘুরতে আসে তাহলে তাদের পাখি দেখানোর গাইড হবেন এই মানুষগুলোই। কিন্তু আর যাতে একটাও পাখি না মারা যায় তার জন্য একটা পাকাপাকি ব্যবস্থা করা দরকার। চিল্কার কালিজয়ী মন্দির এখানকার বেহেরা সম্প্রদায়ের মানুষের কাছে পবিত্রতম স্থান। বারোজন প্রাক্তন শিকারী দেবীর নামে শপথ করলেন এবার থেকে তারা আর পাখি মারবেন না।

বারোজনের সংখ্যাটা ধীরে ধীরে পঞ্চাশে পৌঁছে গেল। এদিকে ২০০০ সালের ১০ই ডিসেম্বর তৈরী হল “শ্রী মহাবীর পক্ষী সুরক্ষা সমিতি”। উড়িষ্যা সরকার গাইডদের ট্রেনিং দেবার পাশাপাশি ২০০১ সালে মঙ্গলাজোড়িকে দিল পক্ষী বন্ধু সম্মান।

বর্তমানে এখানেই তৈরী হয়েছে ইকো কটেজ। মধু বেহেরারা আর পাখি মারেন না। বই পড়েননি তেমন। যা শিখেছেন জলা থেকেই শিখেছেন। ওটাই ওদের বই।

Advertisements