দ্য গ্রিন ওয়াক ব্যুরো : উত্তর ২৪ পরগনার হালিসহরের বাসিন্দা বছর চল্লিশের সরজু কর্মকার | তার হালিশহরের বাড়িতে গেলেই দেখতে পাওয়া যায় অদ্ভূত একটা বাগান | বাগানে শ’দেড়েক বৃক্ষজাতীয় উদ্ভিদ , প্রতিটি উদ্ভিদের একটা করে নাম আছে , কারো সৌরভ গাঙ্গুলী তো কারো অমিতাভ বচ্চন , প্রণব মুখার্জী | “দেশ বিদেশের যত ভালো মানুষ আছেন , যারা পৃথিবীর জন্য অনেক কিছু করেছেন তাদের নামগুলো আমার গাছেদের দিয়ে দিই | বড় মানুষেরাও তো গাছের মতো , গাছ যেমন আমাদের পৃথিবীর প্রাণকে বাঁচিয়ে রেখেছে , তারা আমাদের সভ্যতাকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে | তাই তাদের নামে গাছ লাগাই |” সরজু কর্মকার জানান |

সরজু কর্মকার

সরজু কর্মকার এই বাগানের নাম দিয়েছেন বৃক্ষ আশ্রম | সমস্ত বৃক্ষ আশ্রমেই পৃথিবীর সব ভালো মানুষেরা গাছ হয়ে আছে | শুধু গাছে রূপান্তরিত করা নয় , যাদের গাছ করবেন , সুযোগ পেলেই তিনি তাদের কাছে গাছ নিয়ে চলে যান | এই তো কিছুদিন আগে তিনি ভারতের প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জীর বসত বাড়িতে গাছ নিয়ে হাজির হয়েছেন | প্রণব মুখার্জী তার কাছ থেকে দত্তক নিয়েছেন একটি সিঁধুর গাছ ও একটি মেহগনি গাছ আর বৃক্ষ আশ্রমের জন্য দিয়েছেন একটি মেহগনি গাছ | বৃক্ষ আশ্রমে যেমন আছে বট ,অশ্বত্থ , নিম , অর্জুন গাছ তেমনি বাঙলার বিলুপ্তপ্রায় সব গাছেরা | সরজু কর্মকার বলেন,”আমি বাংলার বিলুপ্ত প্রায় গাছের খোঁজ পেলেই সাথে করে নিয়ে আসি , আদর করে মাটিতে পুঁতে দিই , শেষে একটা নামও | ”

১৯৯৫ থেকে তার গাছ নিয়ে পরিবেশ নিয়ে কাজ করা শুরু | “মাধ্যমিকের মার্কশিট হাতে স্কুল থেকে ফেরার পথে একটা ছোট গাছকে রাস্তায় পরে থাকতে দেখি, গাছের মুখের দিকে তাকিয়ে খুব মায়া হয় , তাকে কোলে করে নিয়ে এসে বাড়িতে লাগিয়ে দিই | সেই থেকেই গাছ আর আমি এক হয়ে গেছি , গাছেদের ভাষা আমি বুঝতে পারি , ওরাও পারে |” সরজু কর্মকার বলেন | ২০০০ তে আরো পাঁচজন নিয়ে তিনি গড়ে তোলেন পরিবেশের একটি সংগঠন | তারপর থেকে তিনি গাছ লাগানোর বার্তা নিয়ে সমস্ত রাজ্যে ঘুরে বেড়িয়েছেন | শুধু ঘুরে বেড়ানো নয় , বিগত কুড়ি বছর ধরে প্রতি বছর তিরিশটি গাছ লাগিয়ে তাদের বড় করার দায়িত্ব নিয়েছেন | ইতি মধ্যেই রাজ্যে ছয়শ বড় গাছ আছে যারা প্রতিদিন অক্সিজেন দেয় | তিনি ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে ঘুরে বেড়ান , প্রতিটি ওয়ার্ডে যাতে কম করে একটি বট , অশ্বত্থ , নিম , অর্জুন , বেল গাছ থাকে |

আপনায় বাড়ি থেকে সাপোর্ট করে এইসব কাজে ? সরজু কর্মকার জানান, “হ্যাঁ করে , না করলে সমস্ত দিন গাছ নিয়ে কী করে থাকি | আমার বউ , দুই ছেলে , মা সবাই বৃক্ষ আশ্রমের কাজে হাত লাগায় , পরিবেশ সচেতনতা মূলক কর্মসূচীতে সাথে থাকে |” এছাড়া সময় পেলেই তাকে দেখা যায় ট্রেনে করে পরিবেশ হকার করতে | অনেকটা ট্রেনের হকারদের কায়দায় মানুষদের বোঝাতে থাকেন গাছ না কাটার উপকারিতা , প্লাস্টিকের খারাপ দিক , জলের অপচয় কীভাবে আটকানো যায় | শুধু ভালো মানুষদের তার বৃক্ষ আশ্রমের গাছে রূপান্তরিত করেই তিনি ক্ষান্ত নন , পৃথিবীর সবার ভিতর একটা সবুজ মন ভরে দেওয়ার আপ্রান চেষ্টা তিনি করেই চলেছেন | আমরা অপেক্ষা করব আরো পরশপাথর সরজুর জন্য , তাহলে হয়ত পৃথিবী বাঁচবে , আমরা বাঁচব |

প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জীকে সরজু কর্মকার গাছ দিচ্ছেন
Advertisements