-শুভজিৎ করচৌধুরী

“সন্ধ্যে তো হয়ে এল বুড়ি, আলো জ্বাললি না”, দুপুরের মৃদু ভাতঘুমের পর প্রথম কথা। আচারের বয়ামগুলো টপাটপ তাকে উঠে গেল, বুড়ি বাবু অমল কমলরা টুংটাং আলো টালো জ্বেলে দিল। মনে মনে সব্বাই প্রার্থনা করছে আজ যেন জ্যোতিবাবু ফের চলে যায়। কারণ অংক স্যার শঙ্কর মাছের চাবুক না কী একটা আনবেন বলেছেন। কী ভাবছেন, কোন জ্যোতিবাবু ?

আসলে নব্বুই এর দশকে যখন খুব লোডশেডিং হত দেশে, তখন আলো গেলেই এরকম একটা কথা শোনা যেত। এখন আরো জ্বালা, আলো যায়না। জয়েন্টের কোচিংয়ে এ.সি চলে। সন্ধ্যে হলেই বিদ্যুতের চাহিদা তুঙ্গে। ২০২২ সালের মধ্যে যেটা আরো বাড়বে। তাই পুরুলিয়ার ঠুরগায় তৈরি হতে চলেছে জলবিদ্যুৎ প্রকল্প। সঙ্গে সঙ্গে উঠে এসেছে হাজারো প্রশ্ন। টিম গ্রিন ওয়াক খানিকটা চেষ্টা করল উত্তর খোঁজার।

পুরুলিয়ার বাঘমুন্ডি ব্লকের অযোধ্যা পাহাড়ে সুবর্ণরেখা নদীর শাখা ঠুরগাকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠতে চলেছে হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনক্ষম ঠুরগা জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র। এর আগে ২০০৭-০৮ সালে এই অযোধ্যাতেই তৈরি হয়েছে ৯০০ মেগাওয়াট ক্ষমতা সম্পন্ন আরেকটি প্রকল্প। প্রকল্প দুটি যে প্রযুক্তির মাধ্যমে গড়ে উঠেছে ও উঠতে চলেছে তাকে পাম্প স্টোরেজ হাইড্রোইলেকট্রিসিটি বলা হয়। নদীর স্রোতে বাঁধ দিয়ে টারবাইন ঘুরিয়ে যে জলবিদ্যুৎ উৎপাদন করা হয় এটা তার থেকে খানিকটা আলাদা। কিন্তু কেমন আলাদা ? দেখা যাক।

আপার রিজার্ভার
যখন বিদ্যুতের চাহিদা তুলনামূলক ভাবে কম থাকে তখন পাম্পের মাধ্যমে জল নিচ থেকে উপরে উঠিয়ে নিয়ে আসা হয়। এতে বিভিন্ন তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রে উৎপাদিত অতিরিক্ত বিদ্যুৎ কম চাহিদার সময় অন্য কাজে ব্যবহৃত হতে থাকে।

ইনটেক টানেল :
সন্ধ্যেবেলা যখন বিদ্যুতের চাহিদা লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ে তখন ইনটেক টানেল দিয়ে জল নিচের রিজার্ভারের মধ্যে ফেলা হয়।

টারবাইন :
বিদ্যুত উৎপাদনের জন্য জলের স্রোত দিয়ে টারবাইন ঘোরানো হয়।

ডিসচার্জ টানেল :
বিদ্যুৎ উৎপাদনের পর এই টানেল দিয়ে জল চলে যায় লোয়ার রিজার্ভারে।

লোয়ার রিজার্ভার :
জল সঞ্চিত থাকে ভবিষ্যতের জন্য। আবার যখন বিদ্যুতের চাহিদা কমে যায় তখন পাম্পের সাহায্যে জল ওপরের রিজার্ভরে তোলা হয়।

অর্থাৎ বিদ্যুতের চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ তৈরি করা যায় এই ধরনের ক্লোসড লুপ পাম্পিং স্টোরেজ হাইড্রোইলেকট্রিক্যাল প্রকল্পগুলিতে।

ঠুরগাতে ঠিক এই ধরনের প্রকল্পেরই উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। একদিকে যেমন এর মাধ্যমে অতিরিক্ত বিদ্যুতের অপচয় বাঁচানো সম্ভব, তেমনই ফসিল ফুয়েল খানিকটা কম পুড়বে গোটা প্রক্রিয়াটার জন্য । তাপবিদ্যুৎ চুল্লি গুলিও প্রয়োজন অনুসারে যখন তখন বন্ধ করা বা নিয়ন্ত্রিত রাখা যায় না।

প্রশ্ন উঠেছে এর জন্য কাটা যাবে লক্ষাধিক গাছ। টিম গ্রিন ওয়াকের সমীক্ষা অনুযায়ী আশঙ্কাটা অমূলক নয়। পরিবেশকর্মী রাহুলদেব বিশ্বাস বলেন , “এতগুলি গাছ কাটা যাবে , তা কখনও মানা যায় না | তাছাড়া অযোধ্যার জঙ্গল হাতি, হায়েনা, ভাম, প্যাঙ্গোলিন সহ বহু ধরনের প্রাণীর বাসস্থান। তাদের বাসস্থানে কোপ পড়বে এর ফলে। পাহাড়ের প্রাকৃতিক গঠন বদলে গেলে প্রাকৃতিক বিপর্যয় ঘটাটাও অস্বাভাবিক নয়। এছাড়া এ অঞ্চলকে কেন্দ্র করে যাদের জীবন জীবিকা চলে তাদের কথাও ভাবা দরকার | হাইকোর্টে প্রকল্পটি নিয়ে একটা মামলা করেছেন অযোধ্যাবাসীরা , ভারতের সংবিধান ও স্তম্ভগুলোর প্রতি পরিপূর্ণ ভরসা আছে |”

ঠুরগা
Advertisements