তিলাবনীর চারদিকে চারটি মিষ্টি গ্রাম তিলাবনী , লেদাবনা , পড়শিবনা , মাধবপুর | চারটি গ্রামে প্রায় হাজার তিনেক মানুষের বাস | ওদের বর্তমান বাজার অর্থনীতির নিরিখে গরীবই বলা যায় , কিন্তু যুগ যুগ ধরে বেশ ভালোই আছে ওরা | অন্তত ওরা তাই মনে করে | এই ভালো থাকার পিছনের রহস্যটা খুব সরল – তিলাবনী পাহাড় | যদিও গ্রামের মানুষ কিন্তু তিলাবনী পাহাড়কে পাহাড় বলে মনে করে না , পাহাড়টা আসলে ওদের দেবতা ; ঠাকুর | ঠাকুরকে ওরা ওদের মতো পূজা করে , সন্তুষ্ট রাখার চেষ্টা করে | ওদের ঠাকুরও ওদের দুই হাত উজাড় করে সব আবদার পূর্ণ করে |

পুরুলিয়ার অনেক অঞ্চলে জলের সমস্যা থাকলেও ওদের কিন্তু জলের অভাব নেই | যদিও আমরা যাকে অভাব বলি তার অনেকটাই তো আসলে আমাদের মনের অবস্থা , স্নানের জন্য বাথরুমের শাওয়ারে গ্যালন গ্যালন জল নষ্ট না করতে পারাটাকে যদি আমরা অভাব ধরি , তাহলে এই অভাবের শেষ নেই | তিলাবনীর কয়েকটি ঝিলে জল সবসময় টলমল করে , যে জল শুধু টলমলে নয় , শরীরের প্রয়োজনীয় নানা খনিজ লবনেও সমৃদ্ধ | ওই জল পেটে পড়লে একটা গোটা পাঠা অনেক খাদ্য রসিকের কাছে হজম করা কোন ব্যাপারই না |

তিলাবনী পাহাড়ের যত কাছে যাওয়া যাবে জমি তত উর্বর ও সবুজ | পাহাড় কথাটি শুনলে আমরা যারা সমতলের মানুষ তাদের কানে কেমন একটা কঠিন কঠিন শুনায় , চোখে ভেসে ওঠে শক্ত একটা পাথরের স্তুপ | কিন্তু ওদের কাছে একেবারেই উল্টো | প্রবীন লাল্টু মাহাতোর মুখে অত্যাশ্চর্য কিছু চরম সত্যি কথা শোনা যায়, “পাহাড় হল আমাদের সমুদ্র | গাছগুলো সব সমুদ্রের জলে ভাসছে |” এতো বড় সত্যি কথা , এতো বড় বিজ্ঞানটা যন্ত্রসভ্যতার আমরা ধরতে পারলাম না , আমাদের কোন বিজ্ঞানী বলতে পারল না | পাহাড়ের তথাকথিত অশিক্ষিত মানুষটা খুব সহজেই বলে দিলেন | অজ্ঞাতপরিচয় তিলাবনী থেকে কুলীন হিমালয় সবই তো এক একটা সমুদ্র , এক একটা ঠাকুর | ঠুরগা হোক কি গোমুখ সবই ঠাকুরের আশির্বাদের হাত |

তিলাবনী ঠাকুর ওদের আরো অনেক কিছু দেয় | যেমন বৃষ্টির পূর্বাভাস | আলিপুর ফেল করে গেলেও ঠাকুরের ভবিষ্যতাভাস কিন্তু সব সময় পাশ | বিশ্বনাথ মাহাতো অতীতের স্মৃতিচারণা করছিলেন , “তিলাবনীর জন্য আমাদের চারটি গ্রামে কোনদিন খরা হয়নি | ‘৮২ তে পুরুলিয়ার অন্যত্র খরা হলেও চারটি গ্রামে ফসলের বান ডেকেছিল | “কোন বড় ঝড়ও চারটি গ্রামে আজ পর্যন্ত তেমনভাবে হয়নি , তিলাবনী ঠাকুর বাতাসের সব শক্তিকে শুষে নিয়ে সৃষ্টির সুধা গ্রাম চারটিতে আশির্বাদের মতো ছড়িয়ে দিয়েছে | ঠাকুর আছে বলে ওদের জ্বালানির কোন অভাব হয় না , জ্বালানি খাতে খরচ তো শূন্যই বলা যায় | রোগের জন্য মানুষের কাড়িকাড়ি এলোমেলো ওষুধ খেতেও হয়না | ঠাকুরের শরীর জুড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা ভেষজ ফল মূল লতা পাতা ওদের সব রোগ দূর করে |

অন্য সব ঠাকুরের মতো তিলাবনীরও গা শিরশিরানি রহস্যও আছে |ঠাকুরের নানা অলৌকিক মাহাত্ম্য ছেলে থেকে বুড়ো সবার মুখে মুখে ফেরে | অনেকেই সাদা ঘোড়ায় চড়ে পূর্ণিমা রাতে তিলাবনীর দেবতাকে গ্রাম পাহারা দিতে দেখেন | তিলাবনীর আশির্বাদ যতদিন আছে গ্রামের মানুষ ততদিন নিরাপদ ; গ্রামের প্রতিটি মানুষ খুব ভালোভাবেই জানে | তাই যেকোন মূল্যে তারা তাদের ঠাকুরকে সন্তুষ্ট রাখতে চায় | তিলাবনীকে সন্তুষ্ট রাখা শুধু চার গ্রামের তিন হাজার ওদের দায়িত্ব নয় , ৮০০ কোটি আমাদেরও দায়িত্ব | না হলে পৃথিবী জুড়ে লক্ষ লক্ষ তিলাবনীর অভিশাপ সহ্য করার জন্য ৮০০ কোটি মাথা যথেষ্ট নয় |

Advertisements