দ্য গ্রিন ওয়াক ব্যুরো : ধরুন বছর বারো তেরোর একটা বাচ্চা ছেলে পকেটে আস্ত বোমা গ্রেনেড নিয়ে ঘুরে বেড়ায়। আঁতকে উঠবেন নিশ্চয়ই। বেশ। চমকানোরই কথা। তারপর ধরুন খোঁজখবর নিয়ে দেখলেন এমন নিপাট ভদ্র ছেলে পাড়ার মধ্যে বিরল। আপনার মনের মধ্যে খুঁতখুঁত। হিসাবটা তো মিলল না।
তারপর ধরুন শুনলেন এই বোমার লোভে প্রজাপতিরা পুলকে অস্থির। পাখিরা আনন্দে বিহ্বল।

সবকিছু গুলিয়ে যাচ্ছে তো ? বেশ। সবুজ বোমার নাম শুনেছেন ? এই বোমার মাল-মশলা কিন্তু মাটি আর সার। মধ্যিখানে কয়েকটি বীজ বা দানা – ডালিম, পেঁপে, কাঁঠাল কিম্বা সূর্যমুখী। যা ইচ্ছা তাই। এই হল আমাদের নিপাট ভদ্র রুকু আর ডানপিটে ডাকাবুকো রূপসাদের সবুজ বোমার মশলা। ওদের পিঠের ব্যাগে বা বুকপকেটে লজেঞ্চুস আর খাতাবইয়ের মধ্যে চাপা পড়ে থাকে। ওরা কড় গোনে বর্ষাকাল আসবে বলে। গোটা গরমের ছুটিতে পড়াশোনা, হোমওয়ার্ক আর খেলাধূলার ফাঁকফোকড় দিয়ে যেই একচিলতে সময় এসে উঁকি মারবে ঘুলঘুলি দিয়ে , নাকে দুয়েকবার সোঁদাসোঁদা গন্ধ এসে ঠোক্কর মেরে জানিয়ে দিয়ে যাবে বর্ষা আগতপ্রায় – অমনি কাজ শুরু করে দেবে রুকু মুকুলরা। মাঠে ঘাটে, পুকুরপাড়ে, নিচুডাঙায়, নদীর তীরে, তেপান্তরে যেখানেই একফালি জায়গা ওরা দেখতে পাবে – ছুঁড়ে দেবে বীজের বল সবুজ বোমা। বন্ধ কারখানার শেড কিম্বা বিমল কাকুর লন্ও বাদ যাবে না। ওরা তো নিজে থেকে গাছ লাগায় না। কি করা! কেন গুলতি দিয়ে ছুঁড়ে দেবে মেটে রঙের বল গুলো। আগামী বর্ষাতে ওগুলো থেকেই বিচ্ছু ছেলের মতো হাত পা ছুঁড়বে সবুজ চারা। বিমলকাকু এদিকে বড্ড অবাক- এখানে গাছ পুঁতলো কে, হ্যাঁ ? ওরা রাস্তা ঘাটে বিমল কাকুকে দেখতে পেলে ফিক্ করে হেসে না দেয় আবার!

রুকু আর রূপসাদের এই অনবদ্য অস্ত্রগুলোকে ইংরেজিতে সীড বল বা সীড বম্ব বলে। অনেককাল আগে মিশরে এই বল গুলো ব্যবহার করতেন প্রাচীন কৃষকেরা। প্রতি বছর বসন্ত কালের বন্যার জল নেমে যাবার পর তারা এগুলো ছুঁড়ে দিতেন জমে থাকা পলির ওপর। আধুনিক কালে সীড বলের ব্যবহার ফের জনপ্রিয় করে তোলেন জাপানী বৈজ্ঞানিক মাসানবু ফুকুয়োকা। জাপান সহ গোটা পৃথিবীতে ন্যাচারাল ফার্মিং এর অন্যতম প্রবক্তা ফুকুয়োকার দর্শনটা আর পাঁচজন মানুষের চেয়ে একটু আলাদা। “কাজ শব্দটাই আমার বড্ড নাপসন্দ। আমরা পাগলের মতো কাজ করে চলি। আমি বরং বলি জীবনধারণ। যেমন ভাবে ট্রপিক্যাল জঙ্গলের পশুরা সকালে আর বিকেলে খাদ্যের সন্ধানে বেরোয় আর দুপুরবেলা চমৎকার একটা ঘুম দিয়ে নেয় সেটাই।” এই আদিম সরলতাতেই ফিরতে চান ফুকুয়োকা। তাঁর সীড বল বানানোর পদ্ধতিটাও বড় সহজ। পাঁচভাগ মাটি আর একভাগ বীজ মিশিয়ে পরিমাণ মতো জল মিশিয়ে লাড্ডুর মতো গোল পাকিয়ে সূর্যের আলোয় দুতিন দিন একটু শুকনো করে নিলেই তৈরি আপনার সীড বম্ব । প্রয়োজন মতো এই মিশ্রণেই আপনি যোগ করে নিতে পারেন খানিকটা গোবর সার, তবে তিনভাগ মাটি হলে দুইভাগের বেশি নয়। এই সার ও মাটির কেন্দ্রে থাকা বীজটিকে যেমন পোকামাকড় কিম্বা গবাদি পশু সহজে ছোঁবে না তেমনই বর্ষার জলে আর কোনোরকম যত্নআত্তি ছাড়াই বীজ থেকে চারা বেড়োবে।

জনৈক পরিবেশকর্মীর মতে, মাটিতে চারা পুঁতলে যেখানে ১০% চারা সাধারণত বেঁচে থাকে সেখানে এই সীড বল প্রক্রিয়ায় লাগানো ৫০% গাছই কোনোররম আদরযত্ন ছাড়াও বড় হতে পারে। কেনিয়ায় সবুজায়নের জন্য ব্যাপক ভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে এই প্রক্রিয়া। সেখানে আকাশ থেকে লাখে লাখে সীড বম্ব ফেলা হচ্ছে । ভারতের দক্ষিণ ও পশ্চিম দিকেও বিচ্ছিন্ন ভাবে চেষ্টা করা হয়েছে। পূর্ব ভারতে গ্রিন ওয়াকের যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে তার জন্য অনেক রুকু আর রূপসা অনেকগুলো সীড বল মনে মনে জমিয়ে রেখেছে । বিমল কাকুরাও এবার নিশ্চয়ই আসবেন ওদের সাথে।

Advertisements