এই সময়ে দাঁড়িয়ে বিপন্ন পরিবেশ সবচেয়ে বড় ইস্যু এ বিষয়ে প্রায় সকলেও একমত | আবার প্রায় সকলেই একমত এই বিষয়েও যে, রাজনৈতিক দলগুলির কাছে ভারতবর্ষে অন্তত পরিবেশ ততটা ইস্যু হয়ে ওঠেনি এখনও | লোকসভা ভোট শুরু হয়ে গেছে , অনেক রাজনৈতিক দলই তাদের ইস্তাহার প্রকাশ করছে | রাজ্যের এই মুহূর্তের প্রধান রাজনৈতিক দল সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেসও তাদের ইস্তাহার প্রকাশ করছে | আসুন দেখি নিই তৃণমূল কংগ্রেসের ইস্তাহারে পরিবেশ কতটা জায়গা পেল |

মমতা ব্যানার্জীর দল তৃণমূল কংগ্রেসের ইস্তাহারে ৬১টি বিষয়কে তুলে ধরেছে , ভোটে জিতলে যেগুলি তৃণমূল করবে | ইস্তাহারে ৩৬তম প্রতিশ্রুতিতে ‘পরিবেশ’ শব্দটি প্রথম ব্যবহার করা হয়েছে | পরিবেশ ক্ষতির কারন হিসাবে ‘বাণিজ্যকরন’ ও ‘নগরায়ন’ কে চিহ্নিত করা হয়েছে | প্যারিস চুক্তির কথা উল্লেখ করে বলা হয়েছে , পরিবেশবান্ধব ও উপকারী পরিবেশ নিয়ম গড়ে তোলা হবে | কিন্তু কীভাবে করা হবে সেই বিষয়ে কোন ব্যখ্যা ইস্তাহারে নেই | রাজ্যে তৃণমূল সরকারের সাতবছরে ‘পরিবেশবান্ধব ও উপকারী পরিবেশ নিয়ম’ না গড়তে পেরেও কীভাবে দেশে তা করা যাবে তারা ব্যাখ্যা ইস্তাহারে নেই |

২০তম প্রতিশ্রুতিতে সমস্ত ভারতবাসীকে বিশুদ্ধ পানীয় জল দেওয়ার অঙ্গীকার করা হয়েছে , কিন্তু সেটি কীভাবে সম্ভব সে বিষয়ে এখানে আলোকপাত করা হয়নি | তবে ৪৯তম প্রতিশ্রুতিকে এর উপায় হিসাবে ধরা যেতে পারে | এখানে রেন ওয়াটার হার্ভেস্টিংয়ের কথা বলা আছে | বৃষ্টির জলকে সঠিক ভাবে ধরা গেলে বিশুদ্ধ পানীয় জলের সমস্যা মিটতে পারে ; নদীগুলির উপর চাপও কমতে পারে | তবে এই মুহূর্তে বৃষ্টি নিয়েও সমস্যা , আগের মতো বৃষ্টি যেমন হয় না তেমনি বৃষ্টির সময়কাল অনেক কমে গেছে , অল্প সময়ে বেশি বৃষ্টি হচ্ছে আবার বছরের বেশিরভাগ সময় অনাবৃষ্টি খরার কারন হচ্ছে | বৃষ্টিকে আগের মতো করা না গেলে বৃষ্টির জল ধরেও সবটুকু সমাধান হবে না , সেইক্ষেত্রে ব্যাপক সবুজায়নের কর্মসূচী দরকার ; যা ইস্তাহারের কোথাও উল্লেখ নেই |

২৩তম প্রতিশ্রুতিটি রাখা হয়েছে কৃষক ও মৎস্যজীবীদের জন্য | কিন্তু এই মুহূর্তে যা দরকার তাহলো জৈব চাষ ; সে বিষয়ে কিছু বলা নেই | তাছারা কৃষককে আর্থিক সাহায্যই তাদের পাশে থাকার অন্যতম উপায় নয় ; জলবায়ুর পরিবর্তনের জন্য কৃষি উৎপাদন ব্যহত হচ্ছে , সে বিষয়ে কোন পরিকল্পনা নেই ইস্তাহারে | মৎসজীবীদের ক্ষেত্রেও একই যুক্তি | মৎসজীবীদের এই মুহূর্তের সবচেয়ে বড় সমস্যা , খাল বিল নদীগুলো আগের মতো যেমন নেই , তারসাথে জলও নেই ; খাল বিল নদী সব ভরাট হয়ে যাচ্ছে , অবৈধ নির্মান গড়ে উঠছে। কিন্তু সে বিষয়েও কিছুই বলা নেই |

৩৭তম প্রতিশ্রুতিতে মোটর ভেইকেল বৃদ্ধির কুপ্রভাবের কথা বলা হয়েছে ও এই বৃদ্ধি আটকানোর কথা বলা আছে , কিন্তু কীভাবে সেটি সম্ভব তা বলা নেই |

৪১তম প্রতিশ্রুতিতে জলপরিবহনে জোর দেওয়া কথা বলা হয়েছে | এটি করা গেলে নদীগুলোর গুরুত্ব বাড়বে , সড়কের উপর চাপ কম পড়বে , সড়ক কম নির্মান করতে হবে | কিন্তু তৃণমূলের রাজ্যের সাতবছরে শাসনকালে যা করা যায়নি তা দেশে কিভাবে করা যাবে তার কোন ব্যাখ্যা কোথাও নেই |

৪৫তম প্রতিশ্রুতিতে অরণ্য আইন পরির্তনের প্রয়োজনীয়তার কথা আছে | অরন্যবাসী মানুষের অধিকারের কথাও বলা হয়েছে। কিন্তু অরণ্য আইনকে কীভাবে কার্যকারী করা যায় তার ব্যাখ্যা জরুরী , কারন এতো দিন আইনটিকে রাজ্যেই ঠিক ভাবে কার্যকারী করা যায়নি | অরণ্যবাসীর অধিকার অনেকটা সোনার পাথরবাটি হয়ে দাঁড়িয়েছে | সেসবের কোন ব্যাখ্যা নেই |

৪৭তম প্রতিশ্রুতিতে ক্লিন এনার্জির কথা বলা হলেও সৌরবিদ্যুতের কথা কেন বলা হল না তাকে কেন গুরুত্ব দেওয়া হল না , এটা নিয়ে ভাবার আছে | ক্লিন এনার্জি সত্যি সত্যি চাইলে সৌরবিদ্যুৎ থেকে পরিবেশবান্ধব এনার্জি হয় কিনা সন্দেহ আছে |

৫৩তম প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী খাদ্য , ওষুধ , জ্বালানির অপচয়ের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা আছে , কিন্তু সেটা কিভাবে সম্ভব বলা হয়নি |

তৃণমূল কংগ্রেসের ইস্তাহারে পরিবেশের অনেকগুলি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উঠে এসেছে যা প্রশংসা পাওয়ার যোগ্য , কিন্তু বিষয়গুলি কম গুরুত্বপূর্ণভাবে উপায় ব্যতিরেকে উপস্থাপন করায় হতাশাও জাগাচ্ছে | সাথে আরো অনেকগুলি বিষয় একেবারেই নেই | যেমন নেই বাড়তে থাকা বিভিন্নরকম দূষণের বিরুদ্ধে কোন পরিকল্পনা , তেমনি রিসাইকেল থেকে শুরু করে প্লাস্টিকের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ , খাল বিল জলাশয় নদী সংস্কার ও পুনরুদ্ধার নিয়ে কিছুই ইস্তাহারে নেই | এক কথায় প্রাকৃতিক পরিবেশ পুনরুদ্ধার করে মানুষের জীবন-জীবিকাকে স্বাভাবিক ও সুস্থ রাখার বিষয়টি ইস্তাহারে ওতটা গুরুত্ব পায়নি | তর্কের খাতিরে এই ইস্তাহারকে একশ শতাংশ সফল করা যাবে বলে ধরে নিলেও, যেহেতু পরিবেশের স্বাভাবিকতা রক্ষার জন্য ইস্তাহারের কর্মসূচী যথেষ্ট নয় তাই মানুষের উপর আর্থিক বোঝা ; ঋণের বোঝা বাড়তেই থাকবে , বেকার সমস্যা আরো জটিল হয়ে উঠবে , পরিবেশ উদবাস্তু হয়ে ঘরহারা মানুষের সংখ্যা বাড়তেই থাকবে , উন্নয়ন শুধুমাত্র গুটিকয়েক মানুষের ভিতরই সীমাবদ্ধ থাকবে |

তবুও ইস্তাহারে পরিবেশের যে বিষয়গুলি উঠে এসেছে , সবগুলি করা গেলে কিছুটা হলেও অবস্থার পরিবর্তন হবে | লোকসভা ভোটে তৃণমূল কংগ্রেস দেশের দায়িত্ব পাবে কিনা সেটা মানুষ ঠিক করবে , কিন্তু রাজ্যের দায়িত্ব তারা সাত বছর আগেই পেয়েছে ; ইস্তাহারের বিষয়গুলি রাজ্যে প্রয়োগ করার সুযোগ তৃণমূল কংগ্রেসের আছে | আপতত সেটুকু অন্তত করা গেলে দেশকে একটা বার্তা দেওয়া যেতে পারে | সেই পথ ধরে গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী যেমন দেশের প্রধানমন্ত্রী হতে পেরেছেন , পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীও দেশের প্রধানমন্ত্রী হতেই পারেন |

Advertisements